Friday, April 23, 2010
সরে দাঁড়ানোর পথ পেলেন না হাফিজ
সরে দাঁড়ানোর পথ পেলেন না হাফিজ
হামলার অভিযোগ বিএনপির ॥ আওয়ামী লীগ বলছে আহতরা হাফিজের বাড়িতে কেন
মামুন-অর-রশিদ/হাসিব রহমান, লালমোহন থেকে ॥ বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কাঁধে রাইফেল রেখে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছিলেন মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন। ভোলা-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে প্রতিপক্ষ প্রার্থী শাওনের পক্ষে গণজোয়ার দেখে। মুখ রক্ষার চেষ্টা করছেন হাফিজ কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে ভোলায় জোটের সাবেক ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন শাহজাহানের বাসায় কেন্দ্রীয় নেতা সেলিমা রহমান, আব্দুল্লাহ আল নোমানের উপস্থিতি ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনার কারণে বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ২৪ এপ্রিলের নির্বাচনে তিনি অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, এর আগে গত বুধবার নির্বাচন সাত দিন পেছানোর দাবি এবং এই দাবি না মানলে চেয়ারপার্সনের সঙ্গে মতবিনিময় করে তিনি নির্বাচনে থাকা-না থাকার বিষয় সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানান। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন কেন্দ্রে স্থানীয়দের পরিবর্তে দূরদূরান্ত থেকে আগত দলীয় কর্মীদের এজেন্ড করার কথা জানান। এদিকে আওয়ামী লীগ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, নির্বাচন কেন্দ্রে গোলযোগ সৃষ্টি এবং নির্বাচন ভুল করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের লৰ্যে বহিরাগতদের পোলিং এজেন্ট করতে চান হাফিজ উদ্দিন। কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় এই পথ খোলা রাখতে চান তিনি বলে অভিযোগ আওয়ামী লীগের। শেষ পর্যন্ত দু'পক্ষের অংশগ্রহণেই নির্বাচন হচ্ছে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই হাফিজ উদ্দিন নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের পায়ে পায়ে দোষ খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি প্রতিদিন দলীয় নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে হামলা-মামলার অভিযোগ করেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার এই আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই শ' ছাড়িয়ে তিন শ'তে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন। তাঁর বাড়িতে একজন লোক শোয়া ছিল যার শরীরে কোন জখমের চিহ্ন ছিল না। হাফিজ উদ্দিন প্রায় ৪০ মিনিট ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলছেন। নির্বাচনী প্রচারের শেষ মুহূর্তে এসে দু'প্রার্থী যেখানে ব্যাপক জনসংযোগে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, কিন্তু দু'পৰই ব্যস্ত ছিল সংবাদ সম্মেলনে। বিকাল সাড়ে তিনটায় শাহবাজ কলেজ মাঠে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন। বিকাল চারটায় নিজের প্রাসাদোপম বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করেন মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন।
মেজর হাফিজ উদ্দিন এই আসন থেকে আটবার নির্বাচন করেন। এরমধ্যে ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। বাকি ছ'টি নির্বাচনে কখনও জাতীয় পার্টি, কখনও বিএনপি, স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচন করেন। এক এগারোর প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি খালেদা-তারেককে ছেড়ে রাতারাতি সংস্কারপন্থী হয়ে যান। এমনকি নতুন দল করে সেই দলের মহাসচিব হয়ে বসেন। বেগম জিয়া মুক্তির পর তিনি আবার নিজেকে বিএনপিতে ভেড়াতে সক্ষম হন। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮'র নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থী মেজর (অব) জসীমের কাছে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। অবসরে যাওয়ার তিন বছর পার হওয়ার আগেই নির্বাচনে অংশ নেয়ায় আইনভঙ্গের কারণে নির্বাচন কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে।
নতুন এই উপ-নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে হাফিজ খুবই আশাবাদী ছিলেন। হাফিজের ধারণা ছিল, ছয়বারের এমপি এবং এবার মেজর জসীমের ১৩ হাজার ভোটে হারলেও উপনির্বাচনে শাওনকে হারানো কোন ব্যাপার হবে না। কিন্তু বাংলা সিনেমার নবাগত মুখের মতো শাওন সর্বত্র বাজিমাত করে ফেলে। সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকলেও দল হিসাবে আওয়ামী লীগ তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে শাওনের সমর্থনে নামে। এতে মাথা খারাপ হয়ে যায় মেজর হাফিজের। তখন কি বলছেন, বলছেন না, আর স্বীকার করছেন, অস্বীকার করছেন কোন কিছুর হিসাব রাখতে পারছে না হাফিজ। সিইসির সঙ্গে বৈঠকে সকল সাংবাদিকের সামনে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পরদিনই বলেছেন, 'সিইসি আমার কোন কথাই রাখেননি। আবার বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে সাতদিন নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলে বলেন, অন্যথায় দলীয় চেয়ারপার্সনের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিবেন তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন কিন। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলনে তিন বেমালুম অস্বীকার করে বলেন, সাতদিন সময় বাড়িয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের কথা বলেছি। নির্বাচনে থাকা না থাকা নিয়ে কিছু বলিনি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা ঢাকায় নাকি বলেছেন, লালমোহন-তজুমদ্দিনে আড়াই শ' লোক আহত হওয়ার অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন বলেন, তাহলে কাদস্বিনীকে কি মরিয়াই প্রমাণ করতে হবে।
এলাকার মানুষের অভিযোগ, হাফিজ এতদিন 'মৌমাছি বাহিনী', 'মার্শাল বাহিনী', 'হকিস্টিক বাহিনীকে', কাজে লাগিয়ে এমপি হতেন। এবারের নির্বাচনে এসব বাহিনী কাজে না লাগাতে পারায় তিনি নির্বাচন বর্জনের নানা পথ খুঁজছেন। তবে নির্বাচনে যাতে গণ্ডগোল হয় এবং সেটি ইস্যু করে নির্বাচন পণ্ড করার ষড়যন্ত্র এখনও তাদের হাতে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অমান্য করে এখনও পর্যন্ত বহিরাগত শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আব্দুল্লাহ আল নোমান, শাম্মী আখতারসহ অসংখ্য বহিরাগতের মেজর হাফিজের বাড়িতে অবস্থান করছেন। বৃহস্পতিবার সকালে সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন শাহজাহানের বাসভবনে নির্বাচন ভণ্ডুলের নীলনকশা চূড়ান্ত করা হয়। সেখানেই বহিরাগতদের পোলিং এজেন্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ বাড়িতেই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনী এলাকায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয় হাফিজ ইব্রাহিম। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর মৌমাছি বাহিনীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়টি কোন ক্রমেই স্বীকার করছে না হাফিজ উদ্দিন। হাফিজ ইব্রাহিম পূর্বনির্ধারিত বিশাল সমাবেশ বাদ দিয়ে মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করে। এতে তেমন লোক সমাগম চোখে পড়েনি।
আওয়ামী লীগের সাংবাদিক সম্মেলন : ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সমন্বয়ক, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ এমপি বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনী এজেন্টের নামে শত শত বাহিরাগত লোক এখানে এনেছে। যারা ভোলা সদরের লোক এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মী। তোফায়েলের প্রশ্ন_আমরা যদি ৮৭ জন এমপি দিয়ে এজেন্ট করি? কিন্তু আমরা স্থানীয়দের দিয়ে এজেন্ট করছি। বিএনপির মূল উদ্দেশ্য নির্বাচন তারা ইস্যু করতে চায়। তারা বহিরাগত এনে নৈরাজ্য করতে চায়।
তোফায়েল আহমেদ বৃহস্পতিবার বিকালে ভোলার লালমোহন শাহাবাজপুর কলেজ মাঠে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতারা ঢাকায় বসে প্রেস ব্রিফিং করে বলে, তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। মাথায় পট্টি বেঁধে বাসায় এনেছে। কিন্তু জুডিশিয়াল তদন্ত টিমের সামনে তারা একজনকেও হাজির করতে পারেনি। তারা মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। আমাদের যে সব নেতা নির্বাচনী প্রচারণায় এসেছে তারা আজ বৃহস্পতিবার চলে যাবে। এমনকি পাশের উপজেলার এমপি জ্যাকবও নির্বাচনের দিন থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সামনে অবাধ, শান্তিপূর্ণ, নির্বাচন করতে যে সিদ্ধান্ত দু'প্রার্থীর সামনে নেয়া হয়েছে তা হাফিজ এখন মানছে না। হাফিজ এখন নতুন ষড়যন্ত্র করছে। তাই নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তাব করছে। কিন্তু এটা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফ বলেন, এলাকায় কোন লোক তাদের ভোটার নয়। তাই বাইরে থেকে এজেন্ট এনেছে। তারা নির্বাচন বিতর্কিত করতে চেষ্টা করছে। তারা ঢাকায় বসে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। তারা কোন ইস্যু না পেয়ে যুদ্ধপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে নির্বাচন বানচাল করতে চায়। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য। জাতি তাদের ভণ্ডামি বুঝে গেছে। নির্বাচনে হেরে যাবার ভয়ে তারা নিত্য নতুন মিথ্যা অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁরানোর পথ খুঁজছে। আওয়ামী নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন_ তোফায়েল আহমেদ, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাসিম, ওমর ফারুক চৌধুরী, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, লিয়াকত শিকদার, বলরাম পোদ্দার, খলিলুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, তিনি পাঁচ বার এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন অথচ এখন এজেন্ট দিতে পারছেন না_ কেন? তাহলে তিনি জনগণের বিরুদ্ধে এমন কিছু করেছেন যাতে কেউ তাঁর এজেন্ট হতে চায় না। নির্বাচন বিতর্কিত করার জন্য তিনি যে নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র করছেন এ বিষয়ে আজ আর কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। বক্তারা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভণ্ডুল করার জন্য তারা এখন ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। বহিরাগতদের ব্যাপারে হাফিজ উদ্দিনই প্রথম প্রশ্ন তুলেছেন, এখন নিজেই বহিরাগতদের পৰে বলছেন, সত্যিই বিচিত্র চরিত্রের লোক সে।
বিএনপির সাংবাদিক সম্মেলন : বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বৃহস্পতিবার বিকালে তাঁর লালমোহন বাসভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এবার পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, রেবের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। মিডিয়াতে তাঁর কথা যথাযথভাবে প্রচার করা হয় না। অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তিনি ৭ দিন নির্বাচন পিছানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু মিডিয়া তা ভুল প্রচার করেছে। তাঁর অভিযোগ_ আওয়ামী লীগ ২/১টি ছাড়া সব মিডিয়াকে ম্যানেজ করেছে।
হাফিজ বলেছেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের আহত করার সেঞ্চুরি হবে এক দিনেই। আমার বাড়িতে রগকাটা, মাথা ফাটা আহতরা এখনও রয়েছে। এখনও কি সিইসির সন্দেহ দূর হবে না। এখানে প্রচুর অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী ঘুরে বেড়াচ্ছে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গ্রামে গ্রামে মাইকিং করে বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক, ভোটারদের হুমকি দিচ্ছে, যাতে ভোট দিতে না যায়। ভোট কেন্দ্রে গেলে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া হবে। আগামী ৩ বছর এলাকায় শান্তিতে থাকতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, ঢাকা থেকে লঞ্চযোগে অত্যাধুনিক গাড়িতে করে এখানে সন্ত্রাসীরা এসেছে। তারা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভোটারদের হুমকি দিচ্ছে।
হাফিজ বলেন, তাঁর বাসায় এখন ৮ জন আহত দলীয় কর্মী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তিনি এ সময় উল্লেখ করেন, বদরপুর আলতাব মেম্বারের বাড়িতে হামলা হয়েছে। ৪/৫টি বাড়ি লুট হয়েছে। র্যাবকে জানানো হলেও তারা যায়নি। রিটার্নিং অফিসার না বললে, র্যাব যাবে না। তালতলা বাজারে বিএনপির কর্মী মাহাবুবুর রহমানসহ ৬/৭ জনকে আহত করেছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। তজুমদ্দিন উপজেলার চাচড়া ইউনিয়নে মাইকিং করে বিএনপির নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে। লালমোহনের ধলিগরনগর ছাত্রদল নেতা মিঠুকে আটকে রেখেছিল। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। জনতা বাজারে মৌলভী নুরুল হক, জহির, আয়শাকে মারধর ও কুপিয়ে আহত করেছে। লালমোহন ইউনিয়নে বিএনপি কর্মী মজিবকে ধান ক্ষেতে নিয়ে পায়ের রগ কর্তন করেছে। এমন কি তার মাকেও কুপিয়েছে।
হাফিজ আরও অভিযোগ করেন, আমার দলের নেতাকর্মীদের ওপর প্রতিপক্ষ দলের সন্ত্রাসীরা শুধু হামলাই করছে না। তারা এখন পুলিশ দিয়ে বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতাকর্মীদেরকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে। তিনি নির্বাচন বর্জন করার কথা নাকোচ করে বলেন, আমার কি মাথা খারাপ, আমি নির্বাচন বয়কট করব। আমি এখানে ৬ বার এমপি হয়েছি।
সংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি আইনকানুন সব জানি। যে সব এলাকায় ব্যাপক সন্ত্রাস হয়েছে ওই এলাাকয় অন্য উপজেলার লোক দিয়ে পোলিং এজেন্ট করা হবে। এ সময় সংসদ সদস্য এ্যানি বলেন, প্রয়োজনে আমরা এমপিরা, বিএনপি নেতৃবৃন্দ এজেন্ট হব। ভোটের দিন ২০ জন জাতীয় নেতা, এমপি থাকার জন্য নির্বাচন কমিশনে জানিয়েছি। তারা দেখবে এলাকার চিত্র।
হাফিজ বলেন, আহতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক দিনেই আহতের সেঞ্চুরি হয়েছে। এত কিছুর পরও সিইসির না কি সন্দেহ যায়নি। কোন নেতাকর্মীর মৃত্যু না হলে তিনি বিশ্বাস করবেন না।
সাংবাদিক সম্মেলন চলাকালে বলা হয়, এইমাত্র একজন বিএনপির কর্মীকে আহত অবস্থায় তাঁর বাড়িতে আনা হয়েছে। ওই সময় সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, মিডিয়াতে বিএনপির নিউজ প্রচার ঠিকমতো হয় না। এ সময় খুব কর্কশ ভাষায় হাফিজ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে এ সময় উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপি, নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি, নিলুফার চৌধুরী মনি এমপি, শামীমা আক্তার এমপি, রাশেদা বেগম হীরা এমপি, বিলকিস জাহান এমপি, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিবুন নবী সোহেল, কৃষক দলের সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদু, সাবেক এমপি সিরিন প্রমুখ।
বিএনপি বিকালে লালমোহন শহরে শেষ নির্বাচনী মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই হাফিজ উদ্দিন নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের পায়ে পায়ে দোষ খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি প্রতিদিন দলীয় নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে হামলা-মামলার অভিযোগ করেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার এই আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই শ' ছাড়িয়ে তিন শ'তে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন। তাঁর বাড়িতে একজন লোক শোয়া ছিল যার শরীরে কোন জখমের চিহ্ন ছিল না। হাফিজ উদ্দিন প্রায় ৪০ মিনিট ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলছেন। নির্বাচনী প্রচারের শেষ মুহূর্তে এসে দু'প্রার্থী যেখানে ব্যাপক জনসংযোগে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, কিন্তু দু'পৰই ব্যস্ত ছিল সংবাদ সম্মেলনে। বিকাল সাড়ে তিনটায় শাহবাজ কলেজ মাঠে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন। বিকাল চারটায় নিজের প্রাসাদোপম বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করেন মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন।
মেজর হাফিজ উদ্দিন এই আসন থেকে আটবার নির্বাচন করেন। এরমধ্যে ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। বাকি ছ'টি নির্বাচনে কখনও জাতীয় পার্টি, কখনও বিএনপি, স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচন করেন। এক এগারোর প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি খালেদা-তারেককে ছেড়ে রাতারাতি সংস্কারপন্থী হয়ে যান। এমনকি নতুন দল করে সেই দলের মহাসচিব হয়ে বসেন। বেগম জিয়া মুক্তির পর তিনি আবার নিজেকে বিএনপিতে ভেড়াতে সক্ষম হন। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮'র নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থী মেজর (অব) জসীমের কাছে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। অবসরে যাওয়ার তিন বছর পার হওয়ার আগেই নির্বাচনে অংশ নেয়ায় আইনভঙ্গের কারণে নির্বাচন কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে।
নতুন এই উপ-নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে হাফিজ খুবই আশাবাদী ছিলেন। হাফিজের ধারণা ছিল, ছয়বারের এমপি এবং এবার মেজর জসীমের ১৩ হাজার ভোটে হারলেও উপনির্বাচনে শাওনকে হারানো কোন ব্যাপার হবে না। কিন্তু বাংলা সিনেমার নবাগত মুখের মতো শাওন সর্বত্র বাজিমাত করে ফেলে। সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকলেও দল হিসাবে আওয়ামী লীগ তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে শাওনের সমর্থনে নামে। এতে মাথা খারাপ হয়ে যায় মেজর হাফিজের। তখন কি বলছেন, বলছেন না, আর স্বীকার করছেন, অস্বীকার করছেন কোন কিছুর হিসাব রাখতে পারছে না হাফিজ। সিইসির সঙ্গে বৈঠকে সকল সাংবাদিকের সামনে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পরদিনই বলেছেন, 'সিইসি আমার কোন কথাই রাখেননি। আবার বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে সাতদিন নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলে বলেন, অন্যথায় দলীয় চেয়ারপার্সনের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিবেন তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন কিন। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলনে তিন বেমালুম অস্বীকার করে বলেন, সাতদিন সময় বাড়িয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের কথা বলেছি। নির্বাচনে থাকা না থাকা নিয়ে কিছু বলিনি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা ঢাকায় নাকি বলেছেন, লালমোহন-তজুমদ্দিনে আড়াই শ' লোক আহত হওয়ার অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন বলেন, তাহলে কাদস্বিনীকে কি মরিয়াই প্রমাণ করতে হবে।
এলাকার মানুষের অভিযোগ, হাফিজ এতদিন 'মৌমাছি বাহিনী', 'মার্শাল বাহিনী', 'হকিস্টিক বাহিনীকে', কাজে লাগিয়ে এমপি হতেন। এবারের নির্বাচনে এসব বাহিনী কাজে না লাগাতে পারায় তিনি নির্বাচন বর্জনের নানা পথ খুঁজছেন। তবে নির্বাচনে যাতে গণ্ডগোল হয় এবং সেটি ইস্যু করে নির্বাচন পণ্ড করার ষড়যন্ত্র এখনও তাদের হাতে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অমান্য করে এখনও পর্যন্ত বহিরাগত শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আব্দুল্লাহ আল নোমান, শাম্মী আখতারসহ অসংখ্য বহিরাগতের মেজর হাফিজের বাড়িতে অবস্থান করছেন। বৃহস্পতিবার সকালে সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন শাহজাহানের বাসভবনে নির্বাচন ভণ্ডুলের নীলনকশা চূড়ান্ত করা হয়। সেখানেই বহিরাগতদের পোলিং এজেন্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ বাড়িতেই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনী এলাকায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয় হাফিজ ইব্রাহিম। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর মৌমাছি বাহিনীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়টি কোন ক্রমেই স্বীকার করছে না হাফিজ উদ্দিন। হাফিজ ইব্রাহিম পূর্বনির্ধারিত বিশাল সমাবেশ বাদ দিয়ে মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করে। এতে তেমন লোক সমাগম চোখে পড়েনি।
আওয়ামী লীগের সাংবাদিক সম্মেলন : ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সমন্বয়ক, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ এমপি বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনী এজেন্টের নামে শত শত বাহিরাগত লোক এখানে এনেছে। যারা ভোলা সদরের লোক এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মী। তোফায়েলের প্রশ্ন_আমরা যদি ৮৭ জন এমপি দিয়ে এজেন্ট করি? কিন্তু আমরা স্থানীয়দের দিয়ে এজেন্ট করছি। বিএনপির মূল উদ্দেশ্য নির্বাচন তারা ইস্যু করতে চায়। তারা বহিরাগত এনে নৈরাজ্য করতে চায়।
তোফায়েল আহমেদ বৃহস্পতিবার বিকালে ভোলার লালমোহন শাহাবাজপুর কলেজ মাঠে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতারা ঢাকায় বসে প্রেস ব্রিফিং করে বলে, তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। মাথায় পট্টি বেঁধে বাসায় এনেছে। কিন্তু জুডিশিয়াল তদন্ত টিমের সামনে তারা একজনকেও হাজির করতে পারেনি। তারা মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। আমাদের যে সব নেতা নির্বাচনী প্রচারণায় এসেছে তারা আজ বৃহস্পতিবার চলে যাবে। এমনকি পাশের উপজেলার এমপি জ্যাকবও নির্বাচনের দিন থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সামনে অবাধ, শান্তিপূর্ণ, নির্বাচন করতে যে সিদ্ধান্ত দু'প্রার্থীর সামনে নেয়া হয়েছে তা হাফিজ এখন মানছে না। হাফিজ এখন নতুন ষড়যন্ত্র করছে। তাই নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তাব করছে। কিন্তু এটা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফ বলেন, এলাকায় কোন লোক তাদের ভোটার নয়। তাই বাইরে থেকে এজেন্ট এনেছে। তারা নির্বাচন বিতর্কিত করতে চেষ্টা করছে। তারা ঢাকায় বসে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। তারা কোন ইস্যু না পেয়ে যুদ্ধপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে নির্বাচন বানচাল করতে চায়। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য। জাতি তাদের ভণ্ডামি বুঝে গেছে। নির্বাচনে হেরে যাবার ভয়ে তারা নিত্য নতুন মিথ্যা অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁরানোর পথ খুঁজছে। আওয়ামী নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন_ তোফায়েল আহমেদ, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাসিম, ওমর ফারুক চৌধুরী, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, লিয়াকত শিকদার, বলরাম পোদ্দার, খলিলুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, তিনি পাঁচ বার এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন অথচ এখন এজেন্ট দিতে পারছেন না_ কেন? তাহলে তিনি জনগণের বিরুদ্ধে এমন কিছু করেছেন যাতে কেউ তাঁর এজেন্ট হতে চায় না। নির্বাচন বিতর্কিত করার জন্য তিনি যে নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র করছেন এ বিষয়ে আজ আর কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। বক্তারা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভণ্ডুল করার জন্য তারা এখন ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। বহিরাগতদের ব্যাপারে হাফিজ উদ্দিনই প্রথম প্রশ্ন তুলেছেন, এখন নিজেই বহিরাগতদের পৰে বলছেন, সত্যিই বিচিত্র চরিত্রের লোক সে।
বিএনপির সাংবাদিক সম্মেলন : বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বৃহস্পতিবার বিকালে তাঁর লালমোহন বাসভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এবার পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, রেবের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। মিডিয়াতে তাঁর কথা যথাযথভাবে প্রচার করা হয় না। অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তিনি ৭ দিন নির্বাচন পিছানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু মিডিয়া তা ভুল প্রচার করেছে। তাঁর অভিযোগ_ আওয়ামী লীগ ২/১টি ছাড়া সব মিডিয়াকে ম্যানেজ করেছে।
হাফিজ বলেছেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের আহত করার সেঞ্চুরি হবে এক দিনেই। আমার বাড়িতে রগকাটা, মাথা ফাটা আহতরা এখনও রয়েছে। এখনও কি সিইসির সন্দেহ দূর হবে না। এখানে প্রচুর অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী ঘুরে বেড়াচ্ছে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গ্রামে গ্রামে মাইকিং করে বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক, ভোটারদের হুমকি দিচ্ছে, যাতে ভোট দিতে না যায়। ভোট কেন্দ্রে গেলে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া হবে। আগামী ৩ বছর এলাকায় শান্তিতে থাকতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, ঢাকা থেকে লঞ্চযোগে অত্যাধুনিক গাড়িতে করে এখানে সন্ত্রাসীরা এসেছে। তারা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভোটারদের হুমকি দিচ্ছে।
হাফিজ বলেন, তাঁর বাসায় এখন ৮ জন আহত দলীয় কর্মী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তিনি এ সময় উল্লেখ করেন, বদরপুর আলতাব মেম্বারের বাড়িতে হামলা হয়েছে। ৪/৫টি বাড়ি লুট হয়েছে। র্যাবকে জানানো হলেও তারা যায়নি। রিটার্নিং অফিসার না বললে, র্যাব যাবে না। তালতলা বাজারে বিএনপির কর্মী মাহাবুবুর রহমানসহ ৬/৭ জনকে আহত করেছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। তজুমদ্দিন উপজেলার চাচড়া ইউনিয়নে মাইকিং করে বিএনপির নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে। লালমোহনের ধলিগরনগর ছাত্রদল নেতা মিঠুকে আটকে রেখেছিল। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। জনতা বাজারে মৌলভী নুরুল হক, জহির, আয়শাকে মারধর ও কুপিয়ে আহত করেছে। লালমোহন ইউনিয়নে বিএনপি কর্মী মজিবকে ধান ক্ষেতে নিয়ে পায়ের রগ কর্তন করেছে। এমন কি তার মাকেও কুপিয়েছে।
হাফিজ আরও অভিযোগ করেন, আমার দলের নেতাকর্মীদের ওপর প্রতিপক্ষ দলের সন্ত্রাসীরা শুধু হামলাই করছে না। তারা এখন পুলিশ দিয়ে বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতাকর্মীদেরকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে। তিনি নির্বাচন বর্জন করার কথা নাকোচ করে বলেন, আমার কি মাথা খারাপ, আমি নির্বাচন বয়কট করব। আমি এখানে ৬ বার এমপি হয়েছি।
সংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি আইনকানুন সব জানি। যে সব এলাকায় ব্যাপক সন্ত্রাস হয়েছে ওই এলাাকয় অন্য উপজেলার লোক দিয়ে পোলিং এজেন্ট করা হবে। এ সময় সংসদ সদস্য এ্যানি বলেন, প্রয়োজনে আমরা এমপিরা, বিএনপি নেতৃবৃন্দ এজেন্ট হব। ভোটের দিন ২০ জন জাতীয় নেতা, এমপি থাকার জন্য নির্বাচন কমিশনে জানিয়েছি। তারা দেখবে এলাকার চিত্র।
হাফিজ বলেন, আহতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক দিনেই আহতের সেঞ্চুরি হয়েছে। এত কিছুর পরও সিইসির না কি সন্দেহ যায়নি। কোন নেতাকর্মীর মৃত্যু না হলে তিনি বিশ্বাস করবেন না।
সাংবাদিক সম্মেলন চলাকালে বলা হয়, এইমাত্র একজন বিএনপির কর্মীকে আহত অবস্থায় তাঁর বাড়িতে আনা হয়েছে। ওই সময় সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, মিডিয়াতে বিএনপির নিউজ প্রচার ঠিকমতো হয় না। এ সময় খুব কর্কশ ভাষায় হাফিজ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে এ সময় উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপি, নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি, নিলুফার চৌধুরী মনি এমপি, শামীমা আক্তার এমপি, রাশেদা বেগম হীরা এমপি, বিলকিস জাহান এমপি, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিবুন নবী সোহেল, কৃষক দলের সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদু, সাবেক এমপি সিরিন প্রমুখ।
বিএনপি বিকালে লালমোহন শহরে শেষ নির্বাচনী মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরম্নদ্ধে প্রতিপক্ষের বহুমাত্রিক চক্রান্ত
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরম্নদ্ধে প্রতিপক্ষের বহুমাত্রিক চক্রান্ত
শাহরিয়ার কবির
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২-এর জানুয়ারিতে আমরা যখন প্রথম সংগঠিতভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করি তখনই '৭১-এর ঘাতক-দালাল যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী আমাদের বিরম্নদ্ধে অভিযোগ এনেছে আমরা নাকি ভারতের দালাল, ঠিক যেমনটি তারা বলত '৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী আওয়ামী লীগকে। জামায়াত আরও বলেছে_ যুদ্ধাপরাধী বলে দেশে নাকি কেউ নেই, জামায়াতের কেউ নাকি যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত নয়, বঙ্গবন্ধু নাকি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন ইত্যাদি।
গত দেড় যুগেরও অধিককাল জামায়াতের '৭১-এর ভূমিকা আমরা জনগণের সামনে তুলে ধরেছি, তৃণমূল থেকে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন যাবতীয় দুষ্কর্মের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছি, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি, কর্মশালা-শোভাযাত্রা, সমাবেশ প্রভৃতির আয়োজন করেছি; জামায়াতীদের এলাকায় পাঠাগার স্থাপন করেছি এবং এভাবেই জামায়াতের প্রকৃত চেহারা দেশবাসী, বিশেষভাবে তরম্নণ প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। আমাদের এসব তৎপরতা শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের প্রত্যনত্ম অঞ্চল অবধি বিসত্মৃত। একই সঙ্গে 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি'র তৎপরতা বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ১২টি দেশে আমাদের শাখা রয়েছে।
আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে জামায়াত যেসব অপপ্রচার করেছে, যেসব প্রশ্ন তুলেছে_ দেশবাসী যে তা প্রত্যাখ্যান করেছে তার প্রমাণ হচ্ছে ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ ইতিহাস সৃষ্টিকারী নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট জাতীয় সংসদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসনে জয়ী হয়েছে, শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে খালেদা-নিজামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের। গত নির্বাচনে জামায়াতের একজন যুদ্ধাপরাধীও নির্বাচিত হতে পারেনি, অথচ এর আগের নির্বাচনে বিএনপির বদৌলতে জামায়াতের ডজনখানেক যুদ্ধাপরাধী জাতীয় সংসদের আসন কলঙ্কিত করেছে, যাদের দু'জনকে খালেদা জিয়া মন্ত্রী পর্যনত্ম বানিয়েছিলেন।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন বিজয়ের দ্বারপ্রানত্মে উপনীত হয়েছে। এ বিজয়ের জন্য আমাদের দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হয়েছে, বহু চড়াই-উৎরাই পেরম্নতে হয়েছে। আন্দোলনের নেতাকমর্ীদের হত্যা, নির্যাতন, চাকরিচু্যতি, মিথ্যা মামলাসহ বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও কবি সুফিয়া কামাল থেকে আরম্ভ করে বিচারপতি কেএম সোবহান পর্যনত্ম বহু নেতাকে আমরা হারিয়েছি, তারপরও এ আন্দোলন থেমে থাকেনি। সত্যকে কখনও প্রতিহত করা যায় না। কিছু সময়ের জন্য মিথ্যার কালো মেঘ সত্যকে আচ্ছন্ন করতে পারে, কিন্তু সত্য সব সময় আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়।
২০০৯ সালে বর্তমান মহাজোট সরকার যখন থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন থেকে '৭১-এর ঘাতক-দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, পায়ের তলার মাটিতে ধস নেমেছে। গত এক বছরে জামায়াতের বহু কমর্ী দলত্যাগ ও দেশত্যাগ করেছে। ধ্বংস অনিবার্য জেনে জামায়াত এখন উন্মাদের মতো আচরণ করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য জামায়াত তাদের দেশী-বিদেশী মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে বহুমাত্রিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে বঙ্গবন্ধুর সরকার কতর্ৃক প্রণীত 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইন ১৯৭৩' অনুযায়ী বিশেষ ট্রাইবু্যনালে। এ আইনে অপরাধের সংজ্ঞা, বিচার পদ্ধতি, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও শাসত্মি সম্পর্কে সবই বলা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি, জাপান ও ফিলিপিন্সসহ বহু দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। এসব ট্রাইবু্যনালে কখনও চিরাচরিত সাক্ষ্য আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি। প্রচলিত ফৌজদারি আইনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার বিচার সম্ভব নয় বলেই জার্মানির নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় নুরেমবার্গের বিশেষ আদালতে বিশেষ নীতি ও বিধান প্রণীত হয়েছিল। বাংলাদেশের '৭৩-এর আইন অতীতের এসব নীতি ও বিধানের নির্যাস গ্রহণ করে ঋদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের আগে পৃথিবীর কোন দেশ মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ, শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যা বিচারের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ নিজস্ব আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়নি।
নুরেমবার্গ বা টোকিও ট্রাইবু্যনালের জন্য প্রণীত নীতি ও বিধানের চেয়ে বাংলাদেশের 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইন' যে অনেক উন্নতমানের এ কথা আনত্মর্জাতিক অঙ্গনের বহু খ্যাতনামা আইনজ্ঞ স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশের সেরা আইনজ্ঞরাসহ নুরেমবার্গ ট্রাইবু্যনালের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীরা এবং ভারতের দু'জন শীর্ষস্থানীয় আইনজ্ঞ এ আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছেন যেটি আমাদের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বিঘি্নত করার জন্য জামায়াত ও বিএনপির আইনজীবীরা '৭৩-এর আইন সম্পর্কে, অপরাধের সংজ্ঞা সম্পর্কে অদ্ভুত সব প্রশ্ন তুলেছেন। সমপ্রতি তাঁরা বলছেন, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে ক্ষমতায় এসে এখন বলছে মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধের বিচার করবে। তাঁরা বিভিন্ন সেমিনারে বা গণমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়টি উত্থাপন করছেন যেন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের। '৭৩-এর আইনে এসব অপরাধের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা এতদসংক্রানত্ম যাবতীয় আনত্মর্জাতিক আইনসম্মত। আমাদের আইনজ্ঞরা '৭৩-এর আইনে যেভাবে এসব অপরাধের সংজ্ঞা দিয়েছেন তার সঙ্গে প্রচুর মিল রয়েছে ২০০২ সালে গৃহীত রোমের আনত্মর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনের।
বাংলাদেশে 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি' গত ১৮ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলছে। '৭৩-এর আইনে 'যুদ্ধাপরাধ', 'মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ', 'শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ', 'গণহত্যা' প্রভৃতির পৃথক সংজ্ঞা দেয়া আছে। তবে সাধারণভাবে আমরা বলি যুদ্ধাপরাধ, অর্থাৎ যুদ্ধাকালীন সময়ে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, গৃহে অগি্নসংযোগ, অপহরণ ও লুণ্ঠনসহ মানবতাবিরোধী যাবতীয় অপরাধ। বাংলাদেশে 'রাজাকার' বলতে শুধু মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াত কতর্ৃক গঠিত রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের বোঝায় না; সকল স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী, সামপ্রদায়িক ব্যক্তিকেই এ দেশে রাজাকার বলা হয়। জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের একটি টেলিভিশন সিরিয়ালে 'তুই রাজাকার' বলে এটিকে স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদীদের সমার্থক শব্দে পরিণত করা হয়েছে। একইভাবে 'যুদ্ধাপরাধী' বলতে আমরা '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ ঘাতক, দালাল, রাজাকার, আলবদর সবাইকে বুঝি।
জামায়াতের নেতারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে গত কয়েক বছর ধরে যেসব প্রলাপোক্তি করছেন তাতে বার বার সেই বাংলা প্রবাদটির কথা মনে হয় 'ঠাকুরঘরে কে? আমি কলা খাই না!' জামায়াতের নেতারা একবার বলেন, '৭১-এ বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের কোন ঘটনা ঘটেনি। আবার বলেন, জামায়াত যুদ্ধাপরাধ করেনি। কখনও বলেন, জামায়াতকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হচ্ছে। কখনও বলেন, ইসলাম ধ্বংসের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে এবং এটা ভারতের ষড়যন্ত্র। জামায়াত যেমন '৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র বলেছে; তাদের পাকিসত্মানী প্রভুরা '৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যনত্ম বাঙালীর সকল আন্দোলন-সংগ্রামকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলেছে। বাংলাদেশের মানুষ যদি এসব বিশ্বাস করত তাহলে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কিংবা ২০০৯-এর ভোটযুদ্ধে পাকিসত্মান এবং তাদের এদেশীয় খেদমতগারদের এত শোচনীয় পরাজয় ঘটত না।
জামায়াতপ্রধান মতিউর রহমান নিজামী সমপ্রতি জামায়াতের জেলা আমিরদের এক সমাবেশে বলেছেন, জামায়াতের নেতারা '৭১-এ যুদ্ধাপরাধ করেননি, তারা শুধু পাকিসত্মানের অখ-তা রক্ষার জন্য কাজ করেছেন। নিজামীর এলাকার ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদশর্ীরা আমাকে বলেছেন পাকিসত্মান রক্ষার জন্য তিনি '৭১-এ কীভাবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে হত্যা-নির্যাতন-লুণ্ঠন প্রভৃতি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার কিছু অংশ আমার প্রামাণ্যচিত্র 'যুদ্ধাপরাধ ৭১'-এ বিধৃত হয়েছে। ট্রাইবু্যনালই বলবে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজামীদের পাকিসত্মান রক্ষার তৎপরতা কোন্ ধরনের অপরাধ।
জামায়াতের কোন নেতা যদি '৭১-এ কোন অপরাধ না করে থাকেন তাহলে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা কেন করছেন? কেন বলছেন বিচার আরম্ভ হলে এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হবে, দেশ অচল করে দেয়া হবে? তারা যদি সত্যিকার অর্থেই কোন অপরাধ না করে থাকেন তাদের উচিত এ বিচারকে স্বাগত জানানো। একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাসত্মি দেয়ার সাধ্য কোন আদালতের নেই। নবগঠিত আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালে অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন, আদালতের রায় তাদের পছন্দ না হলে সুপ্রীমকোর্টে তারা আপীল করতে পারবেন। বিচার ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা প্রত্যক্ষ করার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত পর্যবেক্ষক আসবেন। এদের সামনে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে অপরাধী সাব্যসত্ম করে শাসত্মি দেয়া হবে এটা আমাদের বোধগম্যের অতীত।
হালে জামায়াতের সঙ্গে গলা মিলিয়েছে বিএনপি। দুই দল কোরাসে বলছে, সরকার বিদু্যত-পানি-গ্যাসের সমস্যার সমাধান না করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। বিদু্যত, পানি, গ্যাসের সমস্যার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধ কোথায় আমরা জানি না। তাদের কথা শুনে মনে হতে পারে পিডিবি, ওয়াসা বা তিতাস গ্যাস বুঝি তাদের কাজ বাদ দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজে ব্যসত্ম হয়ে পড়েছে! নাকি আনত্মর্জাতিক ট্রাইবু্যনালের বিচারক ও আইনজীবীরা এতদিন বিদু্যত, পানি, গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন! আমজনতার কাছে বিদু্যত যেমন জরম্নরী, বিচারও জরম্নরী। যে ট্রাইবু্যনাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে বিদু্যত, পানি ও গ্যাসসহ জনজীবনের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তাদের নয়। তবে পিডিবি বা ওয়াসায় যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন কেউ থাকতেই পারেন। তারা জামায়াতের অনত্মর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বিদু্যত, পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছেন কিনা এটা তদনত্ম করে দেখা দরকার।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য আনত্মর্জাতিক অঙ্গনে জামায়াত তাদের পাকিসত্মানী প্রভুদের সহযোগিতা পাচ্ছে। বিভিন্ন আনত্মর্জাতিক ফোরামে পাকিসত্মান বলছে, '৭১-এ পাকিসত্মানী সৈন্যরা বাংলাদেশে কোন গণহত্যা, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ করেনি, বরং বাঙালীরা পাকিসত্মানীদের, বিশেষভাবে অবাঙালী বিহারীদের হত্যা করেছে। এসব কাজে ক্ষেত্রবিশেষে পাকিসত্মান কোথাও বিপুল অর্থের বিনিময়ে প্রবাসী ভারতীয়দেরও ব্যবহার করেছে। শর্মিলা বসু নামে জনৈক আমেরিকা প্রবাসী ভারতীয়, বছর দুই আগে লিখেছেন, '৭১-এ পাকিসত্মানী সৈন্যদের দ্বারা বাঙালী নারী নির্যাতনের অভিযোগ নাকি নির্জলা মিথ্যা, বরং বাঙালীরা যে অবাঙালী নারীদের নির্যাতন করেছে তার নাকি অনেক প্রমাণ আছে। সরকারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা দুই লাখ, বেসরকারী হিসেবে চার লাখেরও বেশি। এ দাবি কোন বাঙালীর নয়, অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক জিওফ্রে ভেডিসের, যিনি '৭২-এর জানুয়ারিতে রেডক্রসের চিকিৎসক দলের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য। তাদের দল প্রথম তিন মাসে দেড় লাখ নারীর গর্ভপাত করেছিল। লন্ডনে ফিরে গিয়ে ডা. ডেভিস বলেছিলেন, '৭১-এ নির্যাতিত নারীর সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। অথচ গবেষক শর্মিলা বসু তাদের একজনকেও নাকি খুঁজে পাননি!
সমপ্রতি ইউরোপ ও আমেরিকা সফরের সময় দেখেছি জামায়াতীদের প্ররোচনায়, নাকি পাকিসত্মানীদের অর্থের বিনিময়ে (!) আইনজীবীদের একটি আনত্মর্জাতিক সংগঠন 'ইন্টারন্যাশনাল বার এ্যাসোসিয়েশন' ধুয়া তুলেছে_ '৭৩-এর আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যাবে না। তারা এ আইনের অনেক সংশোধনীর প্রসত্মাব করেছে। আমাদের ট্রাইবু্যনালে তিনজন বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। 'আইবিএ' বলছে, ট্রাইবু্যনালের বিচারপতি নাকি অভিযুক্তের পছন্দের হতে হবে এবং তিনজন বিচারপতি একমত না হলে নাকি রায় দেয়া যাবে না। পৃথিবীর কোন্ দেশে এমন অসম্ভব, উদ্ভট বিচারব্যবস্থা আছে আমাদের জানা নেই, তবে 'আইবিএ' এবং তাদের তল্পিবাহকদের মতে এসব সংশোধনী না করা হলে এ বিচার নাকি তাদের গ্রহণযোগ্য হবে না। 'আইবিএ'র সুপারিশ আনত্মর্জাতিক অঙ্গনে গুরম্নত্ব পাবে না। কারণ উকিলরা সব সময় মক্কেলের স্বার্থই দেখবে। যুদ্ধাপরাধীরা যদি আইবিএ-র মক্কেল হয় তাহলে এমন উদ্ভট দাবি তারা করতে পারে বৈকি। বিষয়টি উলেস্নখ করছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের উদ্দেশ্যে জামায়াত এবং তাদের পাকিসত্মানী প্রভুদের বহুমাত্রিক তৎপরতা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা প্রদানের জন্য। তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে, আমেরিকান কংগ্রেসে এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থায়। ধর্ণা দিচ্ছে জাতিসংঘের সামনে, হুমকি দিচ্ছে সৌদি আরবে কর্মরত বাঙালী শ্রমিকদের ফেরত পাঠাবার; দেশের ভেতরে নাশকতামূলক কাজের জন্য সংগঠিত করছে জঙ্গী মৌলবাদীদের। জামায়াত এবং তাদের প্রভুদের এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে হবে। জাতিকে মুক্ত করতে হবে দীর্ঘ চার দশকের বিচারহীনতার অভিশাপ থেকে।
২২ এপ্রিল, ২০১০
গত দেড় যুগেরও অধিককাল জামায়াতের '৭১-এর ভূমিকা আমরা জনগণের সামনে তুলে ধরেছি, তৃণমূল থেকে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন যাবতীয় দুষ্কর্মের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছি, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি, কর্মশালা-শোভাযাত্রা, সমাবেশ প্রভৃতির আয়োজন করেছি; জামায়াতীদের এলাকায় পাঠাগার স্থাপন করেছি এবং এভাবেই জামায়াতের প্রকৃত চেহারা দেশবাসী, বিশেষভাবে তরম্নণ প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। আমাদের এসব তৎপরতা শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের প্রত্যনত্ম অঞ্চল অবধি বিসত্মৃত। একই সঙ্গে 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি'র তৎপরতা বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ১২টি দেশে আমাদের শাখা রয়েছে।
আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে জামায়াত যেসব অপপ্রচার করেছে, যেসব প্রশ্ন তুলেছে_ দেশবাসী যে তা প্রত্যাখ্যান করেছে তার প্রমাণ হচ্ছে ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ ইতিহাস সৃষ্টিকারী নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট জাতীয় সংসদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসনে জয়ী হয়েছে, শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে খালেদা-নিজামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের। গত নির্বাচনে জামায়াতের একজন যুদ্ধাপরাধীও নির্বাচিত হতে পারেনি, অথচ এর আগের নির্বাচনে বিএনপির বদৌলতে জামায়াতের ডজনখানেক যুদ্ধাপরাধী জাতীয় সংসদের আসন কলঙ্কিত করেছে, যাদের দু'জনকে খালেদা জিয়া মন্ত্রী পর্যনত্ম বানিয়েছিলেন।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন বিজয়ের দ্বারপ্রানত্মে উপনীত হয়েছে। এ বিজয়ের জন্য আমাদের দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হয়েছে, বহু চড়াই-উৎরাই পেরম্নতে হয়েছে। আন্দোলনের নেতাকমর্ীদের হত্যা, নির্যাতন, চাকরিচু্যতি, মিথ্যা মামলাসহ বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও কবি সুফিয়া কামাল থেকে আরম্ভ করে বিচারপতি কেএম সোবহান পর্যনত্ম বহু নেতাকে আমরা হারিয়েছি, তারপরও এ আন্দোলন থেমে থাকেনি। সত্যকে কখনও প্রতিহত করা যায় না। কিছু সময়ের জন্য মিথ্যার কালো মেঘ সত্যকে আচ্ছন্ন করতে পারে, কিন্তু সত্য সব সময় আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়।
২০০৯ সালে বর্তমান মহাজোট সরকার যখন থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন থেকে '৭১-এর ঘাতক-দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, পায়ের তলার মাটিতে ধস নেমেছে। গত এক বছরে জামায়াতের বহু কমর্ী দলত্যাগ ও দেশত্যাগ করেছে। ধ্বংস অনিবার্য জেনে জামায়াত এখন উন্মাদের মতো আচরণ করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য জামায়াত তাদের দেশী-বিদেশী মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে বহুমাত্রিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে বঙ্গবন্ধুর সরকার কতর্ৃক প্রণীত 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইন ১৯৭৩' অনুযায়ী বিশেষ ট্রাইবু্যনালে। এ আইনে অপরাধের সংজ্ঞা, বিচার পদ্ধতি, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও শাসত্মি সম্পর্কে সবই বলা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি, জাপান ও ফিলিপিন্সসহ বহু দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। এসব ট্রাইবু্যনালে কখনও চিরাচরিত সাক্ষ্য আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি। প্রচলিত ফৌজদারি আইনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার বিচার সম্ভব নয় বলেই জার্মানির নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় নুরেমবার্গের বিশেষ আদালতে বিশেষ নীতি ও বিধান প্রণীত হয়েছিল। বাংলাদেশের '৭৩-এর আইন অতীতের এসব নীতি ও বিধানের নির্যাস গ্রহণ করে ঋদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের আগে পৃথিবীর কোন দেশ মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ, শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যা বিচারের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ নিজস্ব আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়নি।
নুরেমবার্গ বা টোকিও ট্রাইবু্যনালের জন্য প্রণীত নীতি ও বিধানের চেয়ে বাংলাদেশের 'আনত্মর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনালস) আইন' যে অনেক উন্নতমানের এ কথা আনত্মর্জাতিক অঙ্গনের বহু খ্যাতনামা আইনজ্ঞ স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশের সেরা আইনজ্ঞরাসহ নুরেমবার্গ ট্রাইবু্যনালের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীরা এবং ভারতের দু'জন শীর্ষস্থানীয় আইনজ্ঞ এ আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছেন যেটি আমাদের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বিঘি্নত করার জন্য জামায়াত ও বিএনপির আইনজীবীরা '৭৩-এর আইন সম্পর্কে, অপরাধের সংজ্ঞা সম্পর্কে অদ্ভুত সব প্রশ্ন তুলেছেন। সমপ্রতি তাঁরা বলছেন, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে ক্ষমতায় এসে এখন বলছে মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধের বিচার করবে। তাঁরা বিভিন্ন সেমিনারে বা গণমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়টি উত্থাপন করছেন যেন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের। '৭৩-এর আইনে এসব অপরাধের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা এতদসংক্রানত্ম যাবতীয় আনত্মর্জাতিক আইনসম্মত। আমাদের আইনজ্ঞরা '৭৩-এর আইনে যেভাবে এসব অপরাধের সংজ্ঞা দিয়েছেন তার সঙ্গে প্রচুর মিল রয়েছে ২০০২ সালে গৃহীত রোমের আনত্মর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনের।
বাংলাদেশে 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি' গত ১৮ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলছে। '৭৩-এর আইনে 'যুদ্ধাপরাধ', 'মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ', 'শানত্মির বিরম্নদ্ধে অপরাধ', 'গণহত্যা' প্রভৃতির পৃথক সংজ্ঞা দেয়া আছে। তবে সাধারণভাবে আমরা বলি যুদ্ধাপরাধ, অর্থাৎ যুদ্ধাকালীন সময়ে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, গৃহে অগি্নসংযোগ, অপহরণ ও লুণ্ঠনসহ মানবতাবিরোধী যাবতীয় অপরাধ। বাংলাদেশে 'রাজাকার' বলতে শুধু মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াত কতর্ৃক গঠিত রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের বোঝায় না; সকল স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী, সামপ্রদায়িক ব্যক্তিকেই এ দেশে রাজাকার বলা হয়। জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের একটি টেলিভিশন সিরিয়ালে 'তুই রাজাকার' বলে এটিকে স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদীদের সমার্থক শব্দে পরিণত করা হয়েছে। একইভাবে 'যুদ্ধাপরাধী' বলতে আমরা '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ ঘাতক, দালাল, রাজাকার, আলবদর সবাইকে বুঝি।
জামায়াতের নেতারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে গত কয়েক বছর ধরে যেসব প্রলাপোক্তি করছেন তাতে বার বার সেই বাংলা প্রবাদটির কথা মনে হয় 'ঠাকুরঘরে কে? আমি কলা খাই না!' জামায়াতের নেতারা একবার বলেন, '৭১-এ বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের কোন ঘটনা ঘটেনি। আবার বলেন, জামায়াত যুদ্ধাপরাধ করেনি। কখনও বলেন, জামায়াতকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হচ্ছে। কখনও বলেন, ইসলাম ধ্বংসের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে এবং এটা ভারতের ষড়যন্ত্র। জামায়াত যেমন '৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র বলেছে; তাদের পাকিসত্মানী প্রভুরা '৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যনত্ম বাঙালীর সকল আন্দোলন-সংগ্রামকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলেছে। বাংলাদেশের মানুষ যদি এসব বিশ্বাস করত তাহলে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কিংবা ২০০৯-এর ভোটযুদ্ধে পাকিসত্মান এবং তাদের এদেশীয় খেদমতগারদের এত শোচনীয় পরাজয় ঘটত না।
জামায়াতপ্রধান মতিউর রহমান নিজামী সমপ্রতি জামায়াতের জেলা আমিরদের এক সমাবেশে বলেছেন, জামায়াতের নেতারা '৭১-এ যুদ্ধাপরাধ করেননি, তারা শুধু পাকিসত্মানের অখ-তা রক্ষার জন্য কাজ করেছেন। নিজামীর এলাকার ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদশর্ীরা আমাকে বলেছেন পাকিসত্মান রক্ষার জন্য তিনি '৭১-এ কীভাবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে হত্যা-নির্যাতন-লুণ্ঠন প্রভৃতি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার কিছু অংশ আমার প্রামাণ্যচিত্র 'যুদ্ধাপরাধ ৭১'-এ বিধৃত হয়েছে। ট্রাইবু্যনালই বলবে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজামীদের পাকিসত্মান রক্ষার তৎপরতা কোন্ ধরনের অপরাধ।
জামায়াতের কোন নেতা যদি '৭১-এ কোন অপরাধ না করে থাকেন তাহলে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা কেন করছেন? কেন বলছেন বিচার আরম্ভ হলে এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হবে, দেশ অচল করে দেয়া হবে? তারা যদি সত্যিকার অর্থেই কোন অপরাধ না করে থাকেন তাদের উচিত এ বিচারকে স্বাগত জানানো। একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাসত্মি দেয়ার সাধ্য কোন আদালতের নেই। নবগঠিত আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালে অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন, আদালতের রায় তাদের পছন্দ না হলে সুপ্রীমকোর্টে তারা আপীল করতে পারবেন। বিচার ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা প্রত্যক্ষ করার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত পর্যবেক্ষক আসবেন। এদের সামনে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে অপরাধী সাব্যসত্ম করে শাসত্মি দেয়া হবে এটা আমাদের বোধগম্যের অতীত।
হালে জামায়াতের সঙ্গে গলা মিলিয়েছে বিএনপি। দুই দল কোরাসে বলছে, সরকার বিদু্যত-পানি-গ্যাসের সমস্যার সমাধান না করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। বিদু্যত, পানি, গ্যাসের সমস্যার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধ কোথায় আমরা জানি না। তাদের কথা শুনে মনে হতে পারে পিডিবি, ওয়াসা বা তিতাস গ্যাস বুঝি তাদের কাজ বাদ দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজে ব্যসত্ম হয়ে পড়েছে! নাকি আনত্মর্জাতিক ট্রাইবু্যনালের বিচারক ও আইনজীবীরা এতদিন বিদু্যত, পানি, গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন! আমজনতার কাছে বিদু্যত যেমন জরম্নরী, বিচারও জরম্নরী। যে ট্রাইবু্যনাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে বিদু্যত, পানি ও গ্যাসসহ জনজীবনের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তাদের নয়। তবে পিডিবি বা ওয়াসায় যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন কেউ থাকতেই পারেন। তারা জামায়াতের অনত্মর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বিদু্যত, পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছেন কিনা এটা তদনত্ম করে দেখা দরকার।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য আনত্মর্জাতিক অঙ্গনে জামায়াত তাদের পাকিসত্মানী প্রভুদের সহযোগিতা পাচ্ছে। বিভিন্ন আনত্মর্জাতিক ফোরামে পাকিসত্মান বলছে, '৭১-এ পাকিসত্মানী সৈন্যরা বাংলাদেশে কোন গণহত্যা, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ করেনি, বরং বাঙালীরা পাকিসত্মানীদের, বিশেষভাবে অবাঙালী বিহারীদের হত্যা করেছে। এসব কাজে ক্ষেত্রবিশেষে পাকিসত্মান কোথাও বিপুল অর্থের বিনিময়ে প্রবাসী ভারতীয়দেরও ব্যবহার করেছে। শর্মিলা বসু নামে জনৈক আমেরিকা প্রবাসী ভারতীয়, বছর দুই আগে লিখেছেন, '৭১-এ পাকিসত্মানী সৈন্যদের দ্বারা বাঙালী নারী নির্যাতনের অভিযোগ নাকি নির্জলা মিথ্যা, বরং বাঙালীরা যে অবাঙালী নারীদের নির্যাতন করেছে তার নাকি অনেক প্রমাণ আছে। সরকারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা দুই লাখ, বেসরকারী হিসেবে চার লাখেরও বেশি। এ দাবি কোন বাঙালীর নয়, অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক জিওফ্রে ভেডিসের, যিনি '৭২-এর জানুয়ারিতে রেডক্রসের চিকিৎসক দলের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য। তাদের দল প্রথম তিন মাসে দেড় লাখ নারীর গর্ভপাত করেছিল। লন্ডনে ফিরে গিয়ে ডা. ডেভিস বলেছিলেন, '৭১-এ নির্যাতিত নারীর সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। অথচ গবেষক শর্মিলা বসু তাদের একজনকেও নাকি খুঁজে পাননি!
সমপ্রতি ইউরোপ ও আমেরিকা সফরের সময় দেখেছি জামায়াতীদের প্ররোচনায়, নাকি পাকিসত্মানীদের অর্থের বিনিময়ে (!) আইনজীবীদের একটি আনত্মর্জাতিক সংগঠন 'ইন্টারন্যাশনাল বার এ্যাসোসিয়েশন' ধুয়া তুলেছে_ '৭৩-এর আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যাবে না। তারা এ আইনের অনেক সংশোধনীর প্রসত্মাব করেছে। আমাদের ট্রাইবু্যনালে তিনজন বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। 'আইবিএ' বলছে, ট্রাইবু্যনালের বিচারপতি নাকি অভিযুক্তের পছন্দের হতে হবে এবং তিনজন বিচারপতি একমত না হলে নাকি রায় দেয়া যাবে না। পৃথিবীর কোন্ দেশে এমন অসম্ভব, উদ্ভট বিচারব্যবস্থা আছে আমাদের জানা নেই, তবে 'আইবিএ' এবং তাদের তল্পিবাহকদের মতে এসব সংশোধনী না করা হলে এ বিচার নাকি তাদের গ্রহণযোগ্য হবে না। 'আইবিএ'র সুপারিশ আনত্মর্জাতিক অঙ্গনে গুরম্নত্ব পাবে না। কারণ উকিলরা সব সময় মক্কেলের স্বার্থই দেখবে। যুদ্ধাপরাধীরা যদি আইবিএ-র মক্কেল হয় তাহলে এমন উদ্ভট দাবি তারা করতে পারে বৈকি। বিষয়টি উলেস্নখ করছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের উদ্দেশ্যে জামায়াত এবং তাদের পাকিসত্মানী প্রভুদের বহুমাত্রিক তৎপরতা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা প্রদানের জন্য। তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে, আমেরিকান কংগ্রেসে এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থায়। ধর্ণা দিচ্ছে জাতিসংঘের সামনে, হুমকি দিচ্ছে সৌদি আরবে কর্মরত বাঙালী শ্রমিকদের ফেরত পাঠাবার; দেশের ভেতরে নাশকতামূলক কাজের জন্য সংগঠিত করছে জঙ্গী মৌলবাদীদের। জামায়াত এবং তাদের প্রভুদের এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে হবে। জাতিকে মুক্ত করতে হবে দীর্ঘ চার দশকের বিচারহীনতার অভিশাপ থেকে।
২২ এপ্রিল, ২০১০
বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু_ এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা
বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু_ এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা
মোঃ এনায়েত হোসেন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রদের নিয়ে পূর্ববঙ্গ সরকারের সচিবালয় ঘেরাও করেন। পুলিশ ছাত্রদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং শেখ মুজিবসহ ৬৫ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে। ১৯ মার্চ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা আগমন উপলক্ষে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার চুক্তি করেন এবং আটক ছাত্রদের মুক্তি দেন। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রদের একটি শোভাযাত্রা নিয়ে আইন পরিষদের সম্মুখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পূর্ব বাংলার মানুষ ও ছাত্রসমাজের ওপর মুসলিম লীগ সরকারের নির্যাতনের মাত্রা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠন করা হয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান কারারুদ্ধ ছিলেন। ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে তিনি কারামুক্ত হন। তখন বাংলায় দুর্ভিক্ষ চলছে। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ঢাকা আগমন উপলক্ষে আওয়ামী মুসলিম লীগ ভুখা-মিছিল বের করে। পুলিশ রমনা গেটের কাছে মিছিলের নেতা মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। এবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় দু'বছর আটক রাখা হয়।
পূর্ব বাংলার দুর্ভিক্ষ, লবণ সঙ্কট (১৯৫১), দাঙ্গা, রাজনৈতিক নির্যাতন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ব্যর্থতার ফলে মুসলিম লীগ সরকার জনপ্রিয়তা হারায়। দেশের এ সঙ্কটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ঘোষণা করলেন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।" আওয়ামী মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগ এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মুজিব তখন কারাগারে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে মুজিব ও বরিশালের মহিউদ্দিন আহমেদ কারাগারে ১৬ ফেব্রুয়ারি অনশন শুরু করেন। তিনি জেলে থাকাকালে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান প্রমুখ শহীদ হন। ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম হয়। ১৯৫৩ সালে মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার জন্য পূর্ববাংলার গ্রামগ্রঞ্জে প্রচারণা চালান। যুক্তফ্রন্ট এ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে এবং শেখ মুজিব মুসলিম লীগ নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে পরাজিত করে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিবুর রহমান সমবায়, কৃষি ও বন বিভাগের মন্ত্রী নিযুক্ত হন।
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র শেরে বাংলার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনে। তদানীন্তন গবর্নর জেনারেল গোলাম মুহাম্মদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার ফলে ৩১ মে ১৯৫৪ কেন্দ্রীয় সরকার একে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা বাতিল করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। ১৯৫৫ সালের ৩ জুন পূর্ব বাংলা থেকে 'গবর্নর জেনারেলের শাসন' তুলে নিলে শেখ মুজিব মুক্তিলাভ করেন। ঐ সালের ৫ জুন গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব পুনরায় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান গণপরিষদের স্পীকার নির্বাচিত হলেন আবদুল ওয়াহাব খান। ইস্কান্দার মির্জার ষড়যন্ত্রের ফলে যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায়। আওয়ামী মুসলীম লীগ বিরোধী দল গঠন করে। জাতীয় পরিষদ নতুন শাসনতন্ত্র গঠন করলে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দাবি জানান। পাকিস্তান সরকার 'পূর্ব বাংলার' নাম পরিবর্তন করে 'পূর্ব পাকিস্তান' রাখার প্রস্তাব করলে ১৯৫৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান গণপরিষদে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন, 'তারা পূর্ব বাংলার' পরিবর্তে 'পূর্ব পাকিস্তান' করতে চায়। আমরা বার বার দাবি করছি আপনারা এ অঞ্চলের নাম 'বাংলা' করবেন। বাংলার নিজস্ব ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। আপনারা জনগণকে জিজ্ঞাসা না করে এ নামের পরিবর্তন করতে পারবেন না। শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দলের প্রতিবাদ সত্ত্বেও শাসনতন্ত্রে পূর্ব বাংলার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান লেখা হয়।
মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালের ৪ আগস্ট খাদ্যের দাবিতে ঢাকা শহরে বিরাট মিছিল হয় এবং পুলিশ ঐ মিছিলে গুলি করে। মুখ্যমন্ত্রী আবুল হোসেন সরকার পদত্যাগ করে। ৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ নেতা খান আতাউর রহমান খান মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিব শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও ভিলেজ এইড দফতরের দায়িত্ব লাভ করেন। ১১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পাকিস্তানীদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। তারা আওয়ামী লীগকে দ্বিখণ্ডিত করতে সফল হয়। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হয়। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে রয়ে যান। একই ষড়যন্ত্রের কারণে ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। অবশেষে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক আইন জরি করেন। শাসনতন্ত্র বাতিল করে মন্ত্রিসভা ও আইন পরিষদ ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। জেনারেল আইয়ুব খান ২৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে নিজেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। অবশ্য ইতোমধ্যে ১২ অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমানকে কারারুদ্ধ করা হয়। যদিও ১৪ মাস কারাভোগের পর বঙ্গবন্ধু ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি লাভ করেন কিন্তু তাঁর ভাগ্যে বাংলার মুক্ত জলবায়ুতে বেশিদিন অবস্থান করা বোধহয় সম্ভব ছিল না। সামরিক সরকার তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দায়ের করে ১৯৬২ সালে। (ক্রমশ)
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক।
শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রদের নিয়ে পূর্ববঙ্গ সরকারের সচিবালয় ঘেরাও করেন। পুলিশ ছাত্রদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং শেখ মুজিবসহ ৬৫ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে। ১৯ মার্চ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা আগমন উপলক্ষে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার চুক্তি করেন এবং আটক ছাত্রদের মুক্তি দেন। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রদের একটি শোভাযাত্রা নিয়ে আইন পরিষদের সম্মুখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পূর্ব বাংলার মানুষ ও ছাত্রসমাজের ওপর মুসলিম লীগ সরকারের নির্যাতনের মাত্রা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠন করা হয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান কারারুদ্ধ ছিলেন। ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে তিনি কারামুক্ত হন। তখন বাংলায় দুর্ভিক্ষ চলছে। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ঢাকা আগমন উপলক্ষে আওয়ামী মুসলিম লীগ ভুখা-মিছিল বের করে। পুলিশ রমনা গেটের কাছে মিছিলের নেতা মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। এবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় দু'বছর আটক রাখা হয়।
পূর্ব বাংলার দুর্ভিক্ষ, লবণ সঙ্কট (১৯৫১), দাঙ্গা, রাজনৈতিক নির্যাতন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ব্যর্থতার ফলে মুসলিম লীগ সরকার জনপ্রিয়তা হারায়। দেশের এ সঙ্কটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ঘোষণা করলেন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।" আওয়ামী মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগ এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মুজিব তখন কারাগারে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে মুজিব ও বরিশালের মহিউদ্দিন আহমেদ কারাগারে ১৬ ফেব্রুয়ারি অনশন শুরু করেন। তিনি জেলে থাকাকালে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান প্রমুখ শহীদ হন। ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম হয়। ১৯৫৩ সালে মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার জন্য পূর্ববাংলার গ্রামগ্রঞ্জে প্রচারণা চালান। যুক্তফ্রন্ট এ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে এবং শেখ মুজিব মুসলিম লীগ নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে পরাজিত করে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিবুর রহমান সমবায়, কৃষি ও বন বিভাগের মন্ত্রী নিযুক্ত হন।
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র শেরে বাংলার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনে। তদানীন্তন গবর্নর জেনারেল গোলাম মুহাম্মদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার ফলে ৩১ মে ১৯৫৪ কেন্দ্রীয় সরকার একে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা বাতিল করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। ১৯৫৫ সালের ৩ জুন পূর্ব বাংলা থেকে 'গবর্নর জেনারেলের শাসন' তুলে নিলে শেখ মুজিব মুক্তিলাভ করেন। ঐ সালের ৫ জুন গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব পুনরায় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান গণপরিষদের স্পীকার নির্বাচিত হলেন আবদুল ওয়াহাব খান। ইস্কান্দার মির্জার ষড়যন্ত্রের ফলে যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায়। আওয়ামী মুসলীম লীগ বিরোধী দল গঠন করে। জাতীয় পরিষদ নতুন শাসনতন্ত্র গঠন করলে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দাবি জানান। পাকিস্তান সরকার 'পূর্ব বাংলার' নাম পরিবর্তন করে 'পূর্ব পাকিস্তান' রাখার প্রস্তাব করলে ১৯৫৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান গণপরিষদে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন, 'তারা পূর্ব বাংলার' পরিবর্তে 'পূর্ব পাকিস্তান' করতে চায়। আমরা বার বার দাবি করছি আপনারা এ অঞ্চলের নাম 'বাংলা' করবেন। বাংলার নিজস্ব ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। আপনারা জনগণকে জিজ্ঞাসা না করে এ নামের পরিবর্তন করতে পারবেন না। শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দলের প্রতিবাদ সত্ত্বেও শাসনতন্ত্রে পূর্ব বাংলার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান লেখা হয়।
মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালের ৪ আগস্ট খাদ্যের দাবিতে ঢাকা শহরে বিরাট মিছিল হয় এবং পুলিশ ঐ মিছিলে গুলি করে। মুখ্যমন্ত্রী আবুল হোসেন সরকার পদত্যাগ করে। ৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ নেতা খান আতাউর রহমান খান মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিব শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও ভিলেজ এইড দফতরের দায়িত্ব লাভ করেন। ১১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পাকিস্তানীদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। তারা আওয়ামী লীগকে দ্বিখণ্ডিত করতে সফল হয়। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হয়। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে রয়ে যান। একই ষড়যন্ত্রের কারণে ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। অবশেষে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক আইন জরি করেন। শাসনতন্ত্র বাতিল করে মন্ত্রিসভা ও আইন পরিষদ ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। জেনারেল আইয়ুব খান ২৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে নিজেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। অবশ্য ইতোমধ্যে ১২ অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমানকে কারারুদ্ধ করা হয়। যদিও ১৪ মাস কারাভোগের পর বঙ্গবন্ধু ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি লাভ করেন কিন্তু তাঁর ভাগ্যে বাংলার মুক্ত জলবায়ুতে বেশিদিন অবস্থান করা বোধহয় সম্ভব ছিল না। সামরিক সরকার তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দায়ের করে ১৯৬২ সালে। (ক্রমশ)
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক।
যুদ্ধাপরাধীর বিচারে ট্রাইব্যুনাল ॥ প্রশ্নের সুযোগ নেই
যুদ্ধাপরাধীর বিচারে ট্রাইব্যুনাল ॥ প্রশ্নের সুযোগ নেই
০ যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা হয় অজ্ঞ না হয় জেনেশুনেই ভুল তথ্য দিচ্ছেন
০ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনটি অসাধারণ
০ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনটি অসাধারণ
স্টাফ রিপোর্টার ॥ এ দেশের হোক আর অন্য দেশেরই হোক না কেন যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার হবে। কোন আইন ব্যক্তি বিশেষের জন্য হয় না। আইন হয় একটি বিশেষ অপরাধের জন্য। শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর সর্বত্র যত দ-বিধি আছে, সবই অপরাধের বিরুদ্ধে। বিশেষ অপরাধের বিরুদ্ধেই বিশেষ আদালত হয়। যারা আদালত সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে, তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ অথবা জেনেশুনে কথা বলছেন। ট্রাইব্যুনালে কোন বিচারকের প্রতি অনাস্থার সুযোগ নেই। এটা অসাধারণ আইন। দেশে যেমন পানি বিদ্যুত সমস্যা, সেটারও যেমন সমাধান চাই একই সাথে যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার চাই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিদেশী আইনজীবীদের আসা নিয়ে বার কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেবে। ট্রাইব্যুনালে কতগুলো কেস হবে তা তদন্তের ওপরই নির্ভর করবে। তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট যখন আসবে তখন বোঝা যাবে তদন্তকারী সংস্থা বা প্রসিকিউটর লাগবে কিনা। আর আইনে আছে মামলা বেশি হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়বে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান, সদস্য, তদন্তকারী সংস্থার সদস্য ও প্রসিকিউটরদের নিরাপত্তা দেয়া হবে। আমাদের দেশে যথেষ্ট অভিজ্ঞ পর্যাপ্ত আইনজীবী আছে। সে কারণে বাইরে থেকে ধার করে আনার দরকার নেই। অনেকেই আতঙ্কে আছে। কারণ তারা বিদেশে যেতে পারছে না। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দিচ্ছে। এলোমেলোভাবে কথা বলছে। দেশ ছেড়ে পালাতে চায়। পারছে না। কয়েকজনের গ্রেফতারের প্রস্তুতি সম্পন্ন। কাজেই আতঙ্ক থাকা স্বাভাবিক। বৃহস্পতিবার সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে '৭১-এর গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধের বিচার, দেশে-বিদেশে প্রশ্ন শীর্ষক এই আলোচনা সভায় মন্ত্রী, বিচারপতি, আইনজীবিগণ প্রশ্নের উত্তর দেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ক নাগরিক কমিশন ও '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এই প্রশ্ন উত্তর পর্বের আয়োজন করেন। '৭১-এর ঘাতক দালার নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর সভাপতিত্বে ৪৮টি প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রধান বক্তা আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সূচনা বক্তব্য রাখেন '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। প্রশ্নের উত্তর দেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ক নাগরিক কমিশনের সভাপতি বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল ইসলাম, এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, প্রাক্তন সচিব ও রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান, আইন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক এম শাহ আলম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পরিচালক ড. শাহদীন মালিক, সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব এ্যাডভান্সড লিগ্যাল এইড এ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান খান, ল ডেভ বাংলাদেশ নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার ড. তুরীন আফরোজ।
আইনমন্ত্রীর ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছে প্রশ্ন করা হয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে। এখন সরকারের নীতি নির্ধারকরা বলছেন, তাঁরা যুদ্ধাপরাধের বিচার করবেন না, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার করবেন। বিচারের প্রশ্নে সরকারের এই ভিন্ন অবস্থান কেন? এর উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রথমেই বলতে চাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে সরকারের কোন ভিন্ন অবস্থান নেই। যাঁরা শুনছেন তাঁদের বোঝার কিছু ত্রুটি আছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করেছে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ছিল। এ ব্যাপারে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সর্বসম্মতভাবে এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই বিচারটি হবে ১৯৭৩ সালের আইনে। এর পরিধি ব্যাপক। যুদ্ধের সময় যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে শুধু তাই নয়। যারা এ দেশ থেকে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছে। অন্য দেশের হোক না কেন যারা নাগরিকত্ব নিয়েছে তাদেরও বিচার হবে। যারা মানবতাবিরোধী করেছে বা এর সাথে সম্পৃক্ত। এর সাথে যারা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করেছে। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করেছে, এক কথায় বলা যায়, এই আইনের যে ব্যাপকতা তার মধ্যেই অপরাধীদের বিচার হবে। এটা ট্রাইব্যুনালের অধিক্ষেত্র। বিএনপি জামায়াতের আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৭৩-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনাল) আইন এ অভিযুক্তদের সংবিধান প্রদত্ত মানবাধিকারে লঙ্ঘিত হয়েছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এই প্রশ্নটা একেবারেই ভিত্তিহীন। সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে। কোন ব্যক্তি খুন, ধর্ষণ মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী গণহত্যা বা আন্তর্জাতিক আইনে যে সমস্ত অপরাধ চিহ্নিত করে, সেগুলোর বিচার না করলে মানবতাবিরোধী লঙ্ঘন হবে। বাংলাদেশের জনগণও চায় অপরাধীর বিচার হোক। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের ট্রাইবুনালটি যে আইনে স্থাপন করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে তদন্তকারী সংস্থা বাংলাদেশীদের অপরাধ তদন্ত করবে।
১৯৭৩-এ প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবীরা বলছেন, এটি একটি মৃত আইন, কালাকানুন, এই আইন কিসের ভিত্তিতে তেরি হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে সাবেক সচিবও রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, এক কথায় বলব যে, সম্পূর্ণ ভুল বলা হয়েছে। এটা মৃত আইন নয়। কালা আইনও নয়। বিএনপির উর্ধতন নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহম্মেদ বলেছেন, ১৯৭৩-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন হয়েছিল ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য। ১৯৭৪ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীকে বিচার না করে ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে আইনটি অকেজো হয়ে গেছে। এই প্রশ্নের উত্তরে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেন, কোন আইন ব্যক্তিবিশেষের জন্য হয় না। আইন হয় একটি বিশেষ অপরাধের জন্য। তাহলে তো ১৯৫ জনই থাকত। এ সমস্ত আজগুবি কথা বলে মওদুদ সাহেব পার পেতে পারবে না। এটা টাকা পয়সার বিষয় না যে তামাদি হয়ে যাবে। মওদুদকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনার চিন্তা নেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। দেশে ও বিদেশে নবগঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ট্রাইব্যুনাল কি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার করতে পারবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. শাহদীন মালিক বলেন, যাঁরা এ প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অথবা জেনেশুনে ভুল তথ্য দিচ্ছেন। এই আইনে অনেক কিছু নিশ্চিত আছে। তাঁরা বার বার জেনেশুনে মিথ্যা কথা বলছেন। অভিযোগ উঠছে, দলীয় বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের বিচারক, আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গোলাম আরিফ টিপু বলেন, প্রথমত এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দ্বিতীয়ত ভিত্তিহীন, তৃতীয়ত সত্যের সম্পূর্ণ অপলাপ। বিএনপি জামাতের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরও যুদ্ধাপরাধী আছে। নবগঠিত 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' কি আওয়ামী লীগের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারবে? এ প্রশ্নের উত্তরে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ হোসেন বলেছেন, দলে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই। এই প্রশ্নটি একটি স্ববিরোধী প্রশ্ন। এমন ৪৮টি প্রশ্নের উত্তরের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।
আইনমন্ত্রীর ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছে প্রশ্ন করা হয়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে। এখন সরকারের নীতি নির্ধারকরা বলছেন, তাঁরা যুদ্ধাপরাধের বিচার করবেন না, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার করবেন। বিচারের প্রশ্নে সরকারের এই ভিন্ন অবস্থান কেন? এর উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রথমেই বলতে চাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে সরকারের কোন ভিন্ন অবস্থান নেই। যাঁরা শুনছেন তাঁদের বোঝার কিছু ত্রুটি আছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করেছে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ছিল। এ ব্যাপারে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সর্বসম্মতভাবে এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই বিচারটি হবে ১৯৭৩ সালের আইনে। এর পরিধি ব্যাপক। যুদ্ধের সময় যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে শুধু তাই নয়। যারা এ দেশ থেকে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছে। অন্য দেশের হোক না কেন যারা নাগরিকত্ব নিয়েছে তাদেরও বিচার হবে। যারা মানবতাবিরোধী করেছে বা এর সাথে সম্পৃক্ত। এর সাথে যারা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করেছে। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করেছে, এক কথায় বলা যায়, এই আইনের যে ব্যাপকতা তার মধ্যেই অপরাধীদের বিচার হবে। এটা ট্রাইব্যুনালের অধিক্ষেত্র। বিএনপি জামায়াতের আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৭৩-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবু্যনাল) আইন এ অভিযুক্তদের সংবিধান প্রদত্ত মানবাধিকারে লঙ্ঘিত হয়েছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এই প্রশ্নটা একেবারেই ভিত্তিহীন। সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে। কোন ব্যক্তি খুন, ধর্ষণ মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী গণহত্যা বা আন্তর্জাতিক আইনে যে সমস্ত অপরাধ চিহ্নিত করে, সেগুলোর বিচার না করলে মানবতাবিরোধী লঙ্ঘন হবে। বাংলাদেশের জনগণও চায় অপরাধীর বিচার হোক। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের ট্রাইবুনালটি যে আইনে স্থাপন করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে তদন্তকারী সংস্থা বাংলাদেশীদের অপরাধ তদন্ত করবে।
১৯৭৩-এ প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবীরা বলছেন, এটি একটি মৃত আইন, কালাকানুন, এই আইন কিসের ভিত্তিতে তেরি হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে সাবেক সচিবও রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, এক কথায় বলব যে, সম্পূর্ণ ভুল বলা হয়েছে। এটা মৃত আইন নয়। কালা আইনও নয়। বিএনপির উর্ধতন নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহম্মেদ বলেছেন, ১৯৭৩-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন হয়েছিল ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য। ১৯৭৪ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীকে বিচার না করে ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে আইনটি অকেজো হয়ে গেছে। এই প্রশ্নের উত্তরে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেন, কোন আইন ব্যক্তিবিশেষের জন্য হয় না। আইন হয় একটি বিশেষ অপরাধের জন্য। তাহলে তো ১৯৫ জনই থাকত। এ সমস্ত আজগুবি কথা বলে মওদুদ সাহেব পার পেতে পারবে না। এটা টাকা পয়সার বিষয় না যে তামাদি হয়ে যাবে। মওদুদকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনার চিন্তা নেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। দেশে ও বিদেশে নবগঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ট্রাইব্যুনাল কি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার করতে পারবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. শাহদীন মালিক বলেন, যাঁরা এ প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অথবা জেনেশুনে ভুল তথ্য দিচ্ছেন। এই আইনে অনেক কিছু নিশ্চিত আছে। তাঁরা বার বার জেনেশুনে মিথ্যা কথা বলছেন। অভিযোগ উঠছে, দলীয় বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের বিচারক, আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গোলাম আরিফ টিপু বলেন, প্রথমত এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দ্বিতীয়ত ভিত্তিহীন, তৃতীয়ত সত্যের সম্পূর্ণ অপলাপ। বিএনপি জামাতের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরও যুদ্ধাপরাধী আছে। নবগঠিত 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' কি আওয়ামী লীগের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারবে? এ প্রশ্নের উত্তরে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ হোসেন বলেছেন, দলে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই। এই প্রশ্নটি একটি স্ববিরোধী প্রশ্ন। এমন ৪৮টি প্রশ্নের উত্তরের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।
আরও ৫শ' অপরাধীর তালিকা জমা হয়েছে তদন্ত সংস্থায়
আরও ৫শ' অপরাধীর তালিকা জমা হয়েছে তদন্ত সংস্থায়
যুদ্ধাপরাধীর বিচার
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি বৃহস্পতিবার আরও নতুন নতুন তথ্যউপাত্ত ও ৫ শতাধিক অপরাধীর তালিকা জমা দিয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদনত্মকারী সংস্থার নিকট। ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এমএ হাসান তদন্ত কমিটির কাছে তথ্যউপাত্ত দিয়ে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের ওপর নজরদারি রাখতে হবে। তা না হলে তারা বিভিন্নভাবে পালানোর চেষ্টা করবে। অপরাধীদের গৃহবন্দী, পাশাপাশি কয়েক জনকে গ্রেফতার করতে হবে।
ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এমএ হাসান দ্বিতীয় দফায় তদন্তকারী সংস্থার হাতে দালিলিক প্রমাণপত্র তুলে দেন। এর মধ্যে রয়েছে, একটি সংক্ষিপ্ত ৫০০ জনের তালিকা, অপরাধের বিবরণ, সাক্ষীর নাম; বইয়ের মধ্যে রয়েছে, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ, যুদ্ধ ও নারী, পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী ১৯১ জনের নাম, শীর্ষ ১৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী, যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা ও বিচার প্রসঙ্গে। এ ছাড়া অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের উল্লেখসহ '৭১ সালের ঢাকা শহরের মধ্যভূমির ম্যাপ, '৭২ সালের পত্রপত্রিকা, যার মধ্যে আছে দৈনিক ইত্তেফাক, পূর্বদেশ ও দৈনিক বাংলা। সৌদি আরব ও জাতিসংঘকে বিচারের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানানো হয়। সে বিষয়ে রাজকীয় সৌদি আরবের দূতাবাসে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট দেয়া হয়। এ ছাড়া ২টি ডকুমেন্ট দেয়া হয়। এগুলো ইংরেজী ভাষায়।
১৯৭২ সালের ৩ জুলাই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরকারপ্রধান পর্যায়ে সিমলা চুক্তি হওয়ার পরই বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করেছিলেন যে, যুদ্ধাপরাধীরা হয়ত আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। সে কারণেই এটি সংশোধন করা হয়। নুরেমবার্গ ট্রায়াল ও টোকিও ট্রায়ালের পর এটিই হবে সমমানের প্রথম ট্রাইব্যুনাল। তদন্তকারী সংস্থার প্রধান আবদুল মতিন তথ্যউপাত্ত গ্রহণ করে বলেন, এগুলো তদন্ত কাজে সহায়ক হবে।
ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এমএ হাসান দ্বিতীয় দফায় তদন্তকারী সংস্থার হাতে দালিলিক প্রমাণপত্র তুলে দেন। এর মধ্যে রয়েছে, একটি সংক্ষিপ্ত ৫০০ জনের তালিকা, অপরাধের বিবরণ, সাক্ষীর নাম; বইয়ের মধ্যে রয়েছে, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ, যুদ্ধ ও নারী, পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী ১৯১ জনের নাম, শীর্ষ ১৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী, যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা ও বিচার প্রসঙ্গে। এ ছাড়া অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের উল্লেখসহ '৭১ সালের ঢাকা শহরের মধ্যভূমির ম্যাপ, '৭২ সালের পত্রপত্রিকা, যার মধ্যে আছে দৈনিক ইত্তেফাক, পূর্বদেশ ও দৈনিক বাংলা। সৌদি আরব ও জাতিসংঘকে বিচারের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানানো হয়। সে বিষয়ে রাজকীয় সৌদি আরবের দূতাবাসে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট দেয়া হয়। এ ছাড়া ২টি ডকুমেন্ট দেয়া হয়। এগুলো ইংরেজী ভাষায়।
১৯৭২ সালের ৩ জুলাই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরকারপ্রধান পর্যায়ে সিমলা চুক্তি হওয়ার পরই বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করেছিলেন যে, যুদ্ধাপরাধীরা হয়ত আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। সে কারণেই এটি সংশোধন করা হয়। নুরেমবার্গ ট্রায়াল ও টোকিও ট্রায়ালের পর এটিই হবে সমমানের প্রথম ট্রাইব্যুনাল। তদন্তকারী সংস্থার প্রধান আবদুল মতিন তথ্যউপাত্ত গ্রহণ করে বলেন, এগুলো তদন্ত কাজে সহায়ক হবে।
Subscribe to:
Posts (Atom)