Thursday, April 22, 2010

ভোলা-৩ ।। সম্ভবত বিশ্ব-রাজনীতির ইতিহাসে এই দাবী এই প্রথম। (৪)

নির্লজ্জতা, কপটতা, শঠতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন হাফিজ।

তথাকথিত ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বহুধা ও বেহুদা বিভক্ত বিএনপি’র শতাধীক সংসদ সদস্য নিয়ে সেনা অনুপ্রেরনায় গঠিত খালেদাবিহীন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদের ভারে ভারাক্রান্ত সাবেক মেজর হাফিজ’এর রাজনৈতিক মৃত্যু হয়ে গেলেও বিএনপি বলে কথা। যেই দলের প্রথম সারির রাজাকার নেতা সাকা দলের চেয়ারপারসন নামের উভঃলিঙ্গ পদটিকে লেজদ্বারা নিয়ন্ত্রীত কুকুর নামে অভিহিত ও সম্মানিত করায় স্বল্প সময়ের জন্য বহিস্কৃত ও পুনরায় পুরুস্কৃত তাদের আর কিইবা বলার আছে।
দলীয় প্রধানের আনুকুল্য পেতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি হাফিজকে।
কিইবা তার আদর্শ তিনি নিজেই ভাল বলতে পারবেন মোহতারেমা খালেদা। অকাল প্রয়াত স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের সাথে প্রতারনা করে তিনি ঘর বাধেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারের সাথে, তার দ্বারা কি না সম্ভব!

হাফিজকে বানালেন দলের সহ-সভাপতি। বিশ্বাসঘাতকতার কি চরম পুরস্কার!!

এটাতো গেল তার আদর্শের পরিচয়।

আদালতে রায় ও রীট নিস্পত্তি হবার পর থেকেই দলীয় প্রার্থীতা নিশ্চত থাকা হাফিজ ছিলেন প্রচারনায় ব্যাস্ত। যেখানে আওয়ামীলীগকে প্রকারান্তরে শাওনকে প্রার্থী হতে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষক্ষন পর্যন্ত, সেখানে হাফিজ পেয়েছেন প্রচারনায় প্রায় চারগুনেরও বেশি সময়। সেই হাফিজ কিনা বহিরাগত বহিস্কারের ধুয়া তুলে আবেদন করেন নির্বাচন পেছানোর।

মুলত বিএনপি চায়নি তাকে নির্বাচিত করে নিয়ে আসতে, চেয়েছে তাকে রাজনীতির ঘুটি বানিয়ে মাঠ গরম ও কর্মীবাহীনি চাঙ্গা করতে। নির্বাচন অনষ্ঠানের দুই দিন আগে পর্যন্ত না.উ.আলম ছাড়া তার প্রচারনায় আসেনি কোনো কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী খালেদা-তারেক বলয়ের নেতা। প্রসংগত উল্লেখ্য এই না.উ.আলম ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় তারেক পন্থীদের হাতে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলের সামনে জুতাপূজিত হন সংস্কারপন্থী তথা মান্নান-হাফিজপন্থি হবার দায়ে। শেষ সময়ে এসে মায়াকান্না জূড়ে দিলেন মাছের মা মোহতারেমা খালেদা। পাঠালেন গুটিকয় নেতা। হাফিজ আর কি করবে? তার যা করার সে তাই করেছে, দাবী করেছে নির্বাচন পিছিয়ে দেবার- তাও আবার মাত্র এক সপ্তাহ সময়ের জন্য- মাত্র এক সপ্তাহ এবং তাও আবার নির্বাচন অনুষ্ঠীত হবার তারিখ ২৪’এপ্রিল এর দুই দিবস আগে ২১’এপ্রিল।
সম্ভবত বিশ্ব-রাজনীতির ইতিহাসে এই দাবী এই প্রথম।

Wednesday, April 21, 2010

'ব্যর্থ রাষ্ট্র'র ষড়যন্ত্র থেমে নেই!

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের তকমা
'ব্যর্থ রাষ্ট্র'র ষড়যন্ত্র থেমে নেই!
ব্যর্থ রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাদেশকে ঘিরে। এ অভিযোগ পুরনো। মাঝখানে জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারণে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তাত্তি্বকেরা নিশ্চুপ ছিলেন বলে মনে হয়। অথচ জরুরি তত্ত্বাবধায়ক আমলেই রাষ্ট্র দুই বছর ব্যর্থ ছিল। তাত্তি্ব্বকেরা এক অর্থে সফলকাম। জরুরি অবস্থার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে বেশ কিছু দিন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলে আবারও দেশের বিরুদ্ধে ব্যর্থ রাষ্ট্র করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী সাপ্তাহিক 'নিউজ উইক' চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে 'দ্য নেক্সট আল-কায়েদা' বা পরবর্তী আল-কায়েদা শিরোনামে। এরই ধারাবাহিকতায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন দেয় চলতি বছরের ১ মার্চে 'The Threat from Jamaat-ul Mujahideen Bangladesh' শীর্ষক শিরোনামে। সেখানে আইসিজি দেখিয়েছে জামাতুল মুজাহিদিন বা জেএমবি মূলত লস্কর-ই-তৈয়বার হয়ে কাজ করে। যেখানে দেখানো হয় পরবর্তী আল-কায়েদার অন্যতম বাসস্থান বা চারণ ভূমি বাংলাদেশ। নিউজ উইক ও আইসিজি প্রতিবেদনে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীর কজের অন্যতম জায়গা হিসেবে বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়ে অনন্তকালের এক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। এই যুদ্ধ মূলত ভেঙে পড়া পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সচল করার চেষ্টা। পশ্চিমা পুঁজিবাদীদের অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর যুদ্ধের ক্ষতি নিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া দরিদ্র কমজোর সামরিক শক্তির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ও দেশের জনসাধারণ। তবে এ যুদ্ধের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও ধর্মীয় উগ্রবাদের নামেই যুদ্ধটা শুরু হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি এবং তার অবসম্ভাবী ফল বিশ্ব রাজনীতির সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান তুহিনদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মূলত বিশ্ব মন্দা কাটানোর জন্যই। সে সময় শিল্প কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে বিশ্ব এক ভয়াবহ অর্থ সংকটের মধ্যে পড়েছিল। ১৯৩০ সালের সে মন্দাকে ইতিহাসে গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দা বলে অভিহিত করা হয়। সে সময় কোটি কোটি গাড়ি উৎপাদন নষ্ট করতে হয়েছিল গাড়ি কম্পানিগুলোকে। আজকের মন্দায় সেই প্রভাব লক্ষণীয় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে মার্কিনিদের গর্ব বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্র টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার ফলে পৃথিবীর রাজনীতি পাল্টে যায়। ওই হামলায় আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়। প্রথমে আল-কায়েদা হামলার দায়িত্ব অস্বীকার করলেও পরবর্তী সময়ে তারা সাননন্দে তা স্বীকার করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী আক্রমণের স্বীকার_এই অজুহাতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' ঘোষণা করে। প্রথম দিকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই শব্দগুচ্ছ শুনতে ভালো লাগলেও পরবর্তী সময়ে এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ শিকার হতে থাকে একের পর এক তেল, খনিজসম্পদ অথবা ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো। তবে দুর্ভাগ্য মুসলিম ধর্মালম্বী মানুষের জন্য, কারণ বুশের যুদ্ধ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিরুদ্ধে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মার্কিনিরা এক কুৎসিত বর্ণবাদী যুদ্ধেরও অবতারণা করেছে। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, ভেঙে পড়া মার্কিন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনেই এই রকম একটি যুদ্ধের দরকার ছিল। যারা মাইকেল মুরের 'ফারেনাইট নাইন ইলেভান' তথ্যচিত্রটি দেখেছেন, তাঁরা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন টুইন টাওয়ারে হামলার মধ্য দিয়ে মার্কিন অস্ত্র কম্পানিগুলোর জন্য অসম্ভব এক লোভনীয় বাজার তৈরি করেছে। ইরাকে যেসব অস্ত্র দিয়ে হামলা হচ্ছে, তার মধ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র জজ বুশের কম্পানি কার্লাইল অন্যতম।
কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলে যেসব মুসলিম সন্ত্রাসী গ্রুপকে অস্ত্র, অর্থ ও তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা পরিচালনা করত, এই জমানার ঘোষিত সন্ত্রাসীরা কিন্তু সাবেক সেই বন্ধুরাই। আর এ কারণে অনেকে মনে করেন, আল-কায়েদা বলে বাস্তবে কোনো মার্কিনবিরোধী শক্তি নেই, যা আছে তা হলো দেশে দেশে আল-কায়েদা নামে মার্কিনিদের হামলা জায়েজ করার একটি প্রক্রিয়া। বিষয়টি আরো খোলামেলাভাবে বললে এভাবে বলতে হয়, যতদিন আল-কায়েদা থাকবে, ততদিন মার্কিন সৈন্যবাহিনী ও তার মিত্রশক্তি আল-কায়েদা ধ্বংস করার নামে দেশে দেশে হামলা চালানোর বৈধতা তৈরি করবে।
বিশ্ব আজ ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলার শান্তিপূর্ণ কোনো সমাধান নেই। শান্তিপূর্ণ সমাধান না থাকায় তাকে যুদ্ধ বাধাতেই হবে। আর এ কারণে মার্কিন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক অনন্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের মন্দা কাটানোর চেষ্টা করছে। সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে বিশ্ব মন্দার একটি সংক্ষিপ্ত চালচিত্র দেখা যাক।

ধসে পড়ছে পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতি
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সারকথা হলো মুক্তবাজার অর্থনীতি। অর্থনীতিতে বাজার হবে অবাধ এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন। এই নিয়ন্ত্রণহীনতাই জন্ম দিয়েছে সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার। এই মন্দা ইতিমধ্যেই মুক্তবাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনীতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
এবারের বিশ্ব মন্দায় রাষ্ট্রকে তার মুক্তবাজার চরিত্র ভেঙে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হিসেবে দেখছেন। পুঁজিবাদী অর্থনীতি তার নীতির বাইরে গিয়ে বাজার ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয়করণ করছে। কিন্তু তার পরও বিশ্ব মন্দা কাটেনি। চলমান এই বিশ্ব মন্দা এই পর্যায় পেঁৗছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার গৃহনির্মাণ খাতে ঋণদানকারী সর্ববৃহৎ দুটি কম্পানি Freddie Mac, Fannie Mae-কে ২০ হাজার কোটি ডলারের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। আর্থিক বিনিয়োগ ব্যাংক 'লেহম্যান ব্রাদার্স' নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। মার্কিন সরকার এই ধস থামানোর জন্য মার্কিন কংগ্রেসে বেইল আউট কর্মসূচির জন্য ৭০০ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন দিয়েছে। এই অবস্থায়ও যখন ধস থামছে না তখন জি-৭-এর অর্থমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে সংকট মোকাবিলায় আরো বৃহত্তর পরিসরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ বিস্তারিত কর্মসূচির নেওয়ার জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান।

এই মন্দার পরিসর আরো গভীরতর হয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু মার্কিন অর্থনীতি নয়, ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেও মন্দা চলছে। অস্থিতিশীল বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইউরো অঞ্চল নামে পরিচিত ইউরোপের ১৫টি দেশ প্যারিসে বৈঠক করেছে। ইইউর প্রেসিডেন্সি ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই সারকোজি ওই বৈঠকে বলেন, 'আর কোনো ব্যাংকের পতন তাঁরা চান না এবং এ জন্য ২০০৯ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোয় অর্থ ঢালা হবে। তবে যেসব ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপকেরা দায়ী, তাঁদের অবশ্যই চলে যেতে হবে।'
ব্রিটেনে এই সংকট থাবা বসিয়েছে রয়েল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড (আরবিএস), লয়েডস টিএসবি ও এইচবিওএসের ওপর। এ কারণে সংকটে থাকা ব্যংকগুলোকে দেওয়া হবে তিন হাজার ৭০০ কোটি পাউন্ড।
জার্মান সরকার ৫০ হাজার কোটি ইউরোর একটি প্যাকেজ পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে। ফ্রান্স ব্যয় করবে ৩৫ হাজার কোটি ইউরো আর স্পেন সরকার ১০ হাজার কোটি ইউরোর প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে। ইতালি, অস্ট্রিয়াও তাদের মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

খাতওয়ারি লোকসানের একটি চিত্র এবারের মন্দায় ধসে পড়েছে সেবা খাত। হাজার হাজার মানুষের কাছে বিক্রি করা ফ্লাটের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না গ্রাহকেরা। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই মন্দার গোড়ার কথা হলো রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ধস। অথচ কেউ একবার বলছে না যেসব গ্রাহক রিয়েল এস্টেটের কাছ থেকে ফ্লাট বা জমি কিনেছিলেন, তারাই তো প্রথমে কিস্তি শোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা কেন হলো? অর্থাৎ মন্দার গোড়ার কথা রিয়েল এস্টেট নয়। সামগ্রিকভাকে মন্দা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ছোবল দিয়েছে। ফলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি সামগ্রিক ধস নেমেছে, যা বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেবা খাতকে। ২০০৮ সালের অক্টোবরে Realty Track-এর সূত্রে জানা গেছে, ওই বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ ৮১ হাজার ৩০০ বাড়ি নিলামে তোলা হয়েছে, আগস্ট ২০০৭ থেকে এ পর্যন্ত মোট আট লাখ ৫১ হাজার বাড়ি ঋণদাতারা অধিগ্রহণ করার জন্য অগ্রসর হয়েছে। এই তথ্য আরো ভাবনায় ফেলে দেয় যখন জানা যায়, মার্কিনিদের ঘর-বাড়ি হারানোর আরো করুণ কাহিনী। Credit Suisse-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর Rod Dubitsky এক শীর্ষস্থানীয় বিজনেস উইককে জানিয়েছেন, '২০১২ সাল নাগাদ ৫০ লাখেরও বেশি আমেরিকান পরিবার তাদের বাড়ি হারাবে, আর ২০০৮ সালেই বাড়ি হারানো পরিবারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার।'
এই মন্দার প্রভাব বিশ্বজুড়ে অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। তৈরি করেছে পরস্পরের প্রতি এক অদৃশ্য কিন্তু বাস্তব টিকে থাকার সম্পর্ক। মার্কিন মন্দা তাই চীনের বাজার ব্যবস্থায়ও হানা দিয়েছে। মার্কিনিদের রিয়েল এস্টেটের ধস চীনের পিভিসি পাইপ ম্যানুফ্যাকচারিং কমিয়ে দিয়েছে ৩০ শতাংশ উৎপাদন। শুধু পিভিসি নয়, চীনের চারটি বৃহত্তম ইস্পাত কম্পানি ২০ শতাংশ উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে দেশটি। ইউরোপেও এই প্রভাব পড়ায় ইউরোপিয়ান গৃহনির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারকেরা হয় ফ্যাক্টরি বন্ধ নতুবা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
মোটরযান কেনার লোক নেই GM, Ford, Toyota, BMW, Daimler, Volkswagen, Audi, Porsche-এর ইউরোপের কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। এই সংকচনের ফলে শুধু গাড়িশিল্প নয়, এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে অন্য শিল্পেও। ইস্পাত, গ্লাস, রাবার, ইলেকট্রনিক পার্টস, রাবারসহ একাধিক শিল্পে। আরো অসংখ্য খাতের ওপরও তার প্রভাব ফেলছে। তাৎক্ষণিক ফল হচ্ছে বিভিন্ন প্ল্যান্ট ও ফ্যাক্টরি বন্ধ অথবা লে-অফ ঘোষণা। General Motors-এর মধ্যেই তার ছয়টি ফ্যাক্টরি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, যার পাঁচটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত (জর্জিয়া, মিশিগান, নিউইয়র্ক, ওহিও ও উইসকনসিন), সেই সঙ্গে মেক্সিকোর Toluca এবং কানাডার Ontario-তেও প্ল্যান্ট বন্ধের ঘোষণা এসেছে। শুধু তা-ই নয়, জার্মানি, স্পেন, ব্রিটেন, পোল্যান্ড, সুইডেন ও বেলজিয়ামেও ফ্যাক্টরি সাময়িক বন্ধ করছে।
ইউএস গাড়ি-প্রস্তুতকারকেরা দেউলিয়াত্বের কিনারে এসে অটো শ্রমিকদের চাকরির ওপর খৰহস্ত হচ্ছে। জেনারেল মোটর (এগ) গত ১৬ অক্টোবর তাদের তিনটি প্ল্যান্টে (একটি দেলাওয়ার ও বাকি দুটি মিশিগানে-পনটিয়াক ও ডেট্রোইট) এক হাজার ৬০০ কর্মীর লে-অফ ঘোষণা করেছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার অর্ধেক লোকবলকে ছাঁটাই করেছে, শ্রমিকের সংখ্যা এক লাখ ৩৩ হাজার থেকে এখন ৭২ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে।
Chrysler এবং এগ ফাইনান্সিয়াল সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে মার্জারের জন্য ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেছে। Chrysler অবশ্য Renault-Nissan-এর সঙ্গেও মার্জার তথা পার্টনারশিপ অপশন বিবেচনা করছে বা খতিয়ে দেখছে। এটি ২০০৭ সালের শুরু থেকে এর মধ্যেই ২২ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করেছে, আগামী বছরে আরো কমপক্ষে চার হাজার ছাঁটাই করবে।
এ রকম ছাঁটাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, অন্যান্য শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেও শুরু হয়েছে। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানির দুই বৃহৎ অটো-পার্টস প্রস্তুতকারক কম্পানি 'উল্লেখযোগ্য' সংখ্যায় লে-অফের ঘোষণা দিয়েছে। জার্মান অটো-Daimler-এর স্টার্লিং ট্রাক ডিভিশন বন্ধ এবং অন্টারিও, কানাডা ও অরেগন রিজিয়নে প্ল্যান্ট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, যাতে তিন হাজার ৫০০ শ্রমিক কাজ হারাবে।

পাল্টে গেছে বিশ্বযুদ্ধের কৌশল?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মূলত বিশ্ব মন্দা কাটানোর জন্যই। সে সময় শিল্প কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে বিশ্ব এক ভয়াবহ অর্থ সংকটের মধ্যে পড়েছিল। ১৯৩০ সালের সে মন্দাকে ইতিহাসে গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দা বলে অভিহিত করা হয়। সে সময় কোটি কোটি গাড়ি উৎপাদন নষ্ট করতে হয়েছিল গাড়ি কম্পানিগুলোকে। আজকের মন্দায় সেই প্রভাব লক্ষণীয়। বাজার দখলকে কেন্দ্র করে তখন অক্ষশক্তি বনাম মিত্রশক্তির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, যা বিশ্বযুদ্ধ নামে পরিচিত। সে যুগের মন্দায় যেসব বিষয় স্পষ্ট ছিল, আজকের বিশ্ব মন্দায় সে বিষয়গুলো স্পষ্ট। তবে কি বিশ্ব একটি সামগ্রিক বিশ্বযুদ্ধের অপেক্ষায়? যেহেতু অর্থনৈতিক লক্ষণগুলো প্রায় কাছাকাছি।
লক্ষণগুলো কাছাকাছি হলেও আজকের যুগে বিশ্বযুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রায় নেই। কারণ আজকের যুগে বৈশ্বিক মন্দায় এক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই একই কারণে অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করার কোনো উপায় বেছে নেয়, তাহলে কম আক্রান্ত অন্য দেশগুলো সে বিষয়ে বিশেষ কোনো বাধা দেয় না। এমনকি অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য যুদ্ধের রাস্তা বেছে নিলেও।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখন ২০০০ সালের নাইন-ইলেভেনে কথিত সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হওয়ার আগ থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার আগুন লাগা শুরু করেছে। ওয়ার্ল্ডকম, এনরনের মতো জায়ান্ট কম্পানিগুলো লোকসানের দায়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখনই। মার্কিনিদের মন্দার সঙ্গে নাইন-ইলেভেন হামলার একটি সম্পর্ক রয়েছে।
ট্ইন টাওয়ারে হামলার পরে মার্কিনিরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একটি অজুহাত দাঁড় করাতে পেরেছিল। অথচ এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল তাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের যুদ্ধ। একটি অন্যায় যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বযুদ্ধ বেধে যাওয়ার অনেক কারণ ছিল। বিশ্বযুদ্ধ বাধেনি, কারণ না বাধার মতো বাস্তবিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু মার্কিনিরাই নয়, চীনের মতো মার্কিনবিরোধী দেশও এই মন্দায় আক্রান্ত হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মন্দা দ্বারা আক্রান্ত হলে তাদের স্বার্থ কাছাকাছি। বর্তমান বিশ্বে যারা শিল্পোন্নত দেশ, তাদের স্বার্থ অন্যান্য শিল্পন্নোত দেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ ঘোষণা করে অন্যায়ভাবে দেশ আক্রমণ করেছিল, তখন কোনো দেশের জোরালো প্রতিবাদ শক্তি-সামর্থ্য কম হওয়ার কারণে করেনি তা নয়, বরং পরোক্ষে হলেও এই যুদ্ধে তাদের একটি অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।

ব্যর্থ রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র এখনো চলছে
বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র থেমে নেই। এই ষড়যন্ত্রে পশ্চিমাদের সঙ্গে এ দেশীয় কিছু ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ জড়িত_বারবার দেশের সচেতন মহল থেকে এ প্রতিবাদ এসেছে। ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রবক্তারা দেশকে একটি অচল অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়। এক অর্থে রাষ্ট্র কিন্তু বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ব্যর্থই ছিল। সে অর্থে রাষ্ট্র বিগত সেনা সমর্থিত দুই বছরে ব্যর্থ ছিল। যারা এই তত্ত্ব বাংলাদেশে তাদের পত্রিকা মিডিয়া দিয়ে প্রচার করেছিল, তারা কিন্তু সফল। কিন্তু বিপুল আকারে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার রোগ সেবারে স্থায়ীকরণ হয়নি। আর এ কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্দক মিডিয়া যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। তারই প্রতিধ্বনি মূলত নিউজ উইকে দেখা গেছে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং আইসিজির ১ মার্চের প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের ওপর সন্ত্রাসবাদের তকমা লাগানোর যে চেষ্টা প্রথমবার আন্তর্জাতিক শক্তি করেছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানের পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি মাত্র দেশ, যে দেশ সশস্ত্র যুদ্ধ করে মুক্ত হয়েছে, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের দর্শন হিসেবে বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িকতাকে বেছে নিয়েছিল। এখনো বাংলাদেশে স্বাধীনতার চেতনা গভীরভাবে হাজির। আর এ কারণে বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিবাদ নামে যে রাষ্ট্রের ব্যর্থ হওয়ার যড়যন্ত্রের আয়োজন করেছিল দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, তা ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশে জঙ্গি আছে_এই বিষয়টি হলে চলবে না, প্রমাণ করতে হবে বাংলাদেশের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জঙ্গি মনোভাবাপন্ন। যদি জনগোষ্ঠী হিসেবে মুসলিম জঙ্গি_এটা প্রমাণ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ হবে পশ্চিমাদের পরবর্তী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম আক্রমণের জায়গা।
তবে বাংলাদেশে যে জঙ্গি নেই, এটাও সত্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জঙ্গিবাদের রাজনৈতিক বিষয়টি কিভাবে হাজির-নাজির থাকে, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, বাংলাদেশে যত জঙ্গি আছে, তাদের নেতারা সব আফগান ফেরত তালেবান মুজাহিদ। এই জঙ্গি নেতাদের স্বপ্ন কোনো না কোনোভাবেই আফগানিস্তানের তালেবান রাষ্ট্র। এই তালেবান আমদানিতে একটি বিশেষ দেশের গোয়েন্দা সংস্থার দিকে বারবার আঙুল উঠেছে, এখনো উঠছে। অর্থাৎ এ দেশের মানুষের মধ্যে জঙ্গিবাদ নেই, যা আছে তা হলো যড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ জঙ্গি মনোভাবাপন্ন নয়, তাই এ জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে শেকড় গেড়ে বসতে পারেনি। এ দেশের মানুষ ধার্মিক, তারা শান্তিকামী। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কিছুসংখ্যক মানুষকে বিভ্রান্ত করা গেলেও জনগোষ্ঠীর মূল অংশ কখনোই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করবে না।

ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের গুরুত্ব
যদি অর্থনীতির হাল চিত্রে ধরেন রাষ্ট্রের গরিব আর বড়লোকের হিসাব-নিকাশে, তাহলে বাংলাদেশ দরিদ্র দেশের তালিকায় পড়বে। তবে আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য হিসাবের তারতম্য পাল্টে দিচ্ছে। সে হিসেবে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে রয়েছে পৃথিবীর ব্যাপক জনসংখ্যা। বাংলাদেশের চারপাশে রয়েছে পৃথিবীর উদীয়মান পরাশক্তিগুলো। পশ্চিমা বিশ্ব যদি এশিয়া মহাদেশকে নিজেদের কবজায় রাখতে চায়, তবে বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ দেশ আর একটিও নেই। বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী ভারত, বাংলাদেশ থেকে চীনের দূরত্ব খুব বেশি নয়। বাংলাদেশের রয়েছে এক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমুদ্র অঞ্চল। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশকে দিয়েছে_এশিয়া পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর জন্য করে তুলেছে আদর্শস্থানীয়। এই কারণে মার্কিন পরাশক্তি থেকে শুরু করে উদীয়মান শক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে নানা ধরনের চুক্তি করে এ দেশকে তাদের ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তুলতে চায়। এই চেষ্টা যখন সফল হয় না, তখনই তাকে ভিন্নভাবে চেষ্টা করতে হয়। ব্যর্থ রাষ্ট্র তত্ত্ব রপ্তানি করতে হয়। আজকের জমানায় ব্যর্থ রাষ্ট্রের সব থেকে বড় অনুষঙ্গ হলো ইসলামী জঙ্গিবাদ। ভারত ইতিমধ্যে তাদের দেশের অভ্যন্তরে পরিচালিত সব ইসলামী জঙ্গিবাদকে প্রতিহত করেছে এবং করছে। ভারত পশ্চিমাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হতে পারত, অন্তত মুম্বাই হামলার পরে; কিন্তু দেশটি শেষ পর্যন্ত তা হতে দেয়নি। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্র যদি সেখানে শুরু হয়ে যেত, তাহলে ভারত তার উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারত না।
নিউজ উইক লস্কর-ই-তৈয়বাকে পৃথিবীর পরবর্তী আল-কায়েদা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আর সেই পরবর্তী আল-কায়েদার চারণভূমি হবে এশিয়া ছাড়িয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত। এশিয়ায় লস্কর-ই- তৈয়বার অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছে নিউজ উইক।
লস্কর-ই-তৈয়বা পাকিস্তানভিত্তিক একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক দল, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কাছ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে। লস্কর-ই-তৈয়বা মূলত ভারতের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোয় হামলা করে থাকে। ভারতের দাবি, লস্কর-ই-তৈয়বা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার মদদে এগুলো করে থাকে। ভারতের মুম্বাই হামলার পরও কিন্তু ভারত সরকার সে দেশের প্রধান শত্রু বা সমস্যা কিন্তু ইসলামী জঙ্গিবাদকে চিহ্নিত করেনি। আরো অবাক বিষয়, তারা দেশের মধ্যে চলমান মাওবাদী সমস্যাকেই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ ভারতের শাসকশ্রেণী জানে, ইসলামী জঙ্গিবাদের বিপদ হলো বাইরের রাষ্ট্রের আক্রমণ। আর মাওবাদী সমস্যা আর যা-ই হোক, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে পশ্চিমা দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না।
লস্কর-ই-তৈয়বার ক্ষেত্রে আরেকটি বিশেষ বিষয় জড়িত, তা হলো লস্কর-ই-তৈয়বা কি তাদের জানবাজি লড়াইয়ে সাম্প্রতিক কোনো ঘোলা জলে পড়েছে কি না। অর্থাৎ লস্কর-ই-তৈয়বা তাদের স্বাধীন কাশ্মীর আন্দোলন ছেড়ে আন্তর্জাতিকভাবে পশ্চিমাদের হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আক্রমণের ক্ষেত্র তৈরির ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়েছে কি না। যদি হয়, তাহলে লস্কর-ই-তৈয়বা একটি মারাত্দক অস্ত্র হতে পারে পশ্চিমাদের। কারণ পশ্চিমাদের অথনৈতিক সংকট সহসাই কাটছে না। অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের প্রয়োজনে তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আড়ালে দেশ দখলের চেষ্টা করবে।
নিয়মিত বিরতি দিয়ে বাংলাদেশে লস্কর-ই-তৈয়বা ধরা পড়ছে। বাংলাদেশে জেএমবিকে লস্কর-ই-তৈয়বা অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সমর্থন দিয়ে আসছে বলে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সূত্রে জানা গেছে।
নিউজ উইকের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর আইসিজির বিস্তারিত প্রতিবেদনে পরবর্তী আল-কায়েদার টার্গেট হিসেবে বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে। যদি আল-কায়েদার টার্গেট হয়, তবে একই সঙ্গে মার্কিনসহ সন্ত্রাসবিরোধী অন্য পশ্চিমাদের সামরিক টার্গেটের ঝুঁকির মধ্যে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জঙ্গি সমস্যা বাংলাদেশকেই নিরসন করতে হবে। সেই পথ-পদ্ধতি বাংলাদেশকেই বের করতে হবে। জঙ্গি নিরসনের নামে পশ্চিমাদের কোনো সাহায্য নেওয়া কোনোভাবেই সংগত নয়। পশ্চিমারা জঙ্গি দমনে সাহায্যের নামে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম ভূখণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারে; যার সব থেকে ভালো উদাহরণ পাকিস্তান। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের যুদ্ধের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কাজ করে দেশটি আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য সে রকম কোনো পরিণতি কারোই প্রত্যাশিত নয়।

৭ শহীদের রক্তে ভেজা কারাকক্ষ

খাপড়া ওয়ার্ড
৭ শহীদের রক্তে ভেজা কারাকক্ষ
আনু মোস্তফা
১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল দিনটি দেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের নির্যাতন ও দমননীতির বিরুদ্ধে এ দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ছিলেন সোচ্চার। তাই প্রতিবাদী ও সক্রিয় বাম নেতাকর্মীদের দলে দলে গ্রেপ্তার করে দেশের জেলখানা ভরে ফেলা হয়েছিল। তবে নিরাপত্তা ও অন্য সব কারণে বিপ্লবীদের নিয়ে রাখা হতো রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে। নিরাপত্তার দিক থেকে রাজশাহী জেল ছিল শাসকদের অনুকূলে। এই কারাগারেই ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল পুলিশের নির্বিচার গুলিতে নিহত হন সাত বামপন্থী রাজবন্দি। আহত হন আরো ৩১ জন। তাঁরা জেলের ভেতরে বন্দিদের ওপর চালিত নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছিলেন। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের যে ওয়ার্ডে এসব বিপ্লবী নিহত হন, সেই ওয়ার্ডটির নাম ছিল খাপড়া ওয়ার্ড। সেই ওয়ার্ডের নামানুসারে বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ঐতিহাসিক খাপড়া ওয়ার্ড দিবস পালন করেন। রাজশাহী জেলের মধ্যে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে নিহতদের স্মরণে স্বাধীনতার পর তৈরি হয় একটি শহীদ মিনার ও স্মৃতি ফলক। স্মৃতি ফলকে লেখা রয়েছে সাত শহীদের নাম। আহতদের নামও এখানে খোদাই করা রয়েছে। এই দিনে বাম রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে কারাগারের ভেতরে গিয়ে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পালন করেন অন্য সব কর্মসূচিও।
জানা যায়, ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে সারা দেশের জেলখানাগুলোতে বন্দিদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জেলের ভেতরে বন্দিদের ওপর জুলুম-নির্যাতন বাড়ছিল সেই সময়টায়। রাজশাহী জেলও তখন বিনা অপরাধে আটক বন্দিদের দ্বারা পূর্ণ ছিল। বন্দিদের মধ্যে অনেক নারী কর্মীও তখন জেলে আটক ছিলেন। এসব রাজবন্দির প্রতি জেলখানায় নির্দয় আচরণ ও তাঁদের ওপর জুলুম-নির্যাতনসহ তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদিদের মর্যাদায় রাখা নিয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিরা আন্দোলন করে আসছিলেন অনেক দিন ধরে। এই সময়ে নাচোলের কৃষক আন্দোলন হয়। সেই আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রকেও রাজশাহী কারাগারে আনা হয়। ইলা মিত্রের ওপর রাজশাহী জেলেও চলে অমানবিক নির্যাতন। তা ছাড়া এই জেলে কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে মুসলমান ও হিন্দুসহ আদিবাসী বন্দিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালাতে থাকে। রাজবন্দিরা এসব বুঝতে পেরে অনশনের হুমকি দেন কর্তৃপক্ষকে। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিরা ১৫ দিনের নোটিশে জেলখানায় নির্যাতন বন্ধসহ সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে উসকানি দেওয়ার প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠান। কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে বন্দিরা ১৯৫০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি অনশন শুরু করেন। পরে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলে বন্দিরা সেবারের মতো অনশন প্রত্যাহার করেন।
এদিকে রাজবন্দিদের দিয়ে ঘানি টানানো, তাঁদের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সেলে রাখাসহ নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৫০ জন বন্দি ১৯৫০ সালের ৫ এপ্রিল অনশন শুরু করেন। পরে এক হাজারের বেশি বন্দি তাঁদের সঙ্গে অনশনে যোগ দেন। এই অনশন চলাকালীন ১৫ জন রাজবন্দিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের জন্য নির্ধারিত সেল বা ১৪ নম্বর সেলে রাখার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। এ খবর জানাজানি হলে বন্দিরা সেখানে যেতে অস্বীকার করেন। তাঁরা প্রতিবাদ করেন। এ সময় বন্দিরা কারাগারে অনশনের পাশাপাশি ধর্মঘটও শুরু করেন। বলতে গেলে ওই সময় জেলখানার পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে জেল কর্তৃপক্ষও। তখন তারা আরো দমননীতি চালাতে শুরু করে।
১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল দিনটি ছিল বন্দিদের কাছে এক ভয়াবহ বেদনার দিন। এদিন সকাল ৯টার দিকে অবাঙালি জেল সুপার বিল, জেলার আবদুল মান্নান কারারক্ষীদের নিয়ে জেলের ভেতরে প্রবেশ করেন। জেল সুপার রাজবন্দিদের ১৪ নম্বর সেলে যেতে চাপপ্রয়োগ করেন। রাজবন্দিরা কনডেম সেলে যাওয়ার ব্যাপারে ঘোর আপত্তি করলে জেল সুপার বিল হাতের ছড়ি দিয়ে বন্দিদের প্রহারে উদ্যত হন। এ সময় কয়েকজন বন্দি বিলের হাতের ছড়ি ধরে ফেলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন জেল সুপার। খাপড়া ওয়ার্ড প্রাঙ্গণে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে নিহত হন হানিফ শেখ, সুখেন ভট্টাচার্য, দেলওয়ার হোসেন, সুধীন ধর, বিজন সেন, কম্পরাম সিং ও আনোয়ার হোসেন। তাঁরা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী। জেলে পুলিশের গুলিতে আহত হন আরো ৩১ জন। আহতদের মধ্যে ছিলেন মনসুর হাবিব, নুরুন্নবী চৌধুরী, আবদুল হক, অমূল্য লাহিড়ী, বাবর আলী প্রমুখ। রাজশাহী জেলের বন্দিদের ওপর পুলিশের গুলির প্রতিবাদে সারা দেশে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। এই আন্দোলন দমনে শাসকগোষ্ঠী আরো মরিয়া হয়ে ওঠে।
জানা যায়, স্বাধীনতার পর কমরেড মণি সিং রাজশাহী জেলের মধ্যে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিফলক ও শহীদ মিনার উদ্বোধন করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়া এবং এরশাদের সামরিক শাসনামলে জেলের ভেতরে খাপড়া ওয়ার্ড দিবসের সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি পালনের অনুমতি ছিল না। তবে ১৯৯৬ সালে সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা অনেক দিন পর প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক খাপড়া ওয়ার্ড দিবস পালনে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশের অনুমতি লাভ করেন। ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ও রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আমরা প্রতিবছরই ঐতিহাসিক খাপড়া ওয়ার্ড দিবসের কর্মসূচি পালন করি। এবারও করা হবে। মাঝে বেশ কয়েক বছর জোট সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জেলের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি। এবার যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বিচারের দিনপঞ্জি

বিচারের দিনপঞ্জি
৬ এপ্রিল
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বিচারে পাকিস্তান কোনো হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ওই দেশের হাইকমিশনার আশরাফ কোরেশী।
সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে কোরেশী বলেন, 'এ বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমাদের হস্তক্ষেপের প্রশ্নই আসে না।' পাকিস্তান এই বিচারের বিরোধিতা কিংবা বিচার যেন না হয়, সে ব্যাপারে কোনো ধরনের লবিং করছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

৭ এপ্রিল
গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতারের দাবি করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই দাবিতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দেন সংগঠনের সদস্য-সচিব এমদাদ হোসেন মতিন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এদিন বেশ কিছু দলিল তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য, দালিলিক প্রমাণ ও গ্রন্থ তদন্ত সংস্থাকে দিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, বিভিন্ন অপরাধীর বিষয়ে তদন্ত সংস্থার কাছে যে রিপোর্ট আছে, যারা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ছিল তাদের গ্রেপ্তার করা যেতে পারে এবং গ্রেপ্তার করা উচিতও।

৯ এপ্রিল
জঙ্গিদের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে অভিযুক্ত ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ইবনে সিনা হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং অবিলম্বে এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। এসব আয়ের উৎস বন্ধ করতে না পারলে জামায়াত যুদ্ধাপরাধবিরোধী বিচার ঠেকাতে বিভিন্ন হামলা চালাবে।

১০ এপ্রিল
দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও কূটনীতিকরা বলেছেন, স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এমনকি অনেক মন্ত্রীও কোনো এখতিয়ার না থাকলেও প্রতীকি বিচার হবে বলে ভুল প্রচার করছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৩৯তম বার্ষিকী পালন উপলক্ষে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উদ্যোগে বিকালে রাজধানীর বিলিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত সভার এ অভিযোগ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী।

১১ এপ্রিল
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সরেজমিন দেখতে এদিন আকস্মিক দর্শনার্থী হিসেবে হাজির হয়েছিল দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। পুরনো হাইকোর্ট ভবনে অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল তারা ঘুরে দেখেছে এবং কথা বলেছে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।
শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে ভৈরবের ১৯টি স্কুলের দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়। শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে তারা হাইকোর্ট ভবনসহ ট্রাইব্যুনাল ঘুরে দেখে। শিক্ষার্থীরা আইনজীবী প্যানেলের প্রধান গোলাম আরিফ টিপু ও প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল মতিনের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ করে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ে তাঁদের প্রশ্ন করে।
ক্ষুদে দর্শনার্থী প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী প্যানেলের প্রধান গোলাম আরিফ টিপু বলেন, আমরা খুবই খুশি। শিক্ষার্থীরাও চায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তাদের বিচার হোক। তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিকশিত হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে।
প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল মতিন জানিয়েছেন, একাত্তরে বিভিন্ন অপরাধে যুক্তদের ব্যাপারে তথ্য প্রদানে আগ্রহী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে তারা তদন্ত সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক শহীদ পরিবার চিঠির মাধ্যমে ও মুক্তিযোদ্ধারা এসে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এগুলো ছাড়াও ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

১৩ এপ্রিল
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে সৌদি সরকার এখন পর্যন্ত কোনো নেতিবাচক মনোভাব দেখায়নি। এ বিচার হলে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেরও অবনতির কোনো আশঙ্কা নেই। বরং আগামীতে সৌদি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করতে চায়। 'এ বিচার হলে বাংলাদেশ সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানির বাজার হারাবে'_এই প্রচারণাকে ভিত্তিহীন আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আব্দুল্লাহ বিন নাসের আল বুসাইরী।
বুসাইরী গতকাল টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এর সঙ্গে সৌদি আরবকে জড়ানো ঠিক হচ্ছে না। '৭১ সালের ঘটনার বিচারের সঙ্গে সৌদি আরবের কোনো সম্পর্ক নেই।' তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে সৌদি আরবকে সম্পৃক্ত না করতে দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রচার মাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, 'বিএনপি-জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দলেরই সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই।' সৌদি রাষ্ট্রদূত বলেন, 'বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পরও দূতাবাস থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে এবং একই বিষয় আমরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও জানিয়েছি।'

১৭ এপ্রিল
মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজেদের ভূমিকা নিয়ে লুকোচুরি করবে না জামায়াতে ইসলামী। দলের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুক্রবার মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জামায়াতের ইসলামীর জেলা আমির সম্মেলনে তৃণমূলের নেতাদেরও একই কৌশল অনুসরণ করতে বলেছেন।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বৈরী পরিস্থিতির শিকার হচ্ছিল। এ বিষয়ে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'একাত্তরে আমাদের ভূমিকা নিয়ে কোনোদিনও লুকোচুরি করিনি। আমরা পাকিস্তানের অবকাঠামোর পক্ষে ছিলাম, কিন্তু পাকিস্তানের কাঠামো ভেঙে যাওয়ার পর এক মুহূর্তের জন্যও আমরা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলাম না। গোলাম আযম সাহেবও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী আমির সম্মেলনে প্রথমবাবের মতো স্বীকার করেন, 'একাত্তরে জামায়াত আন্তরিকভাবে পাকিস্তানকে এক রাখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এ চেষ্টা বাস্তব ছিল না।'

গ্রন্থনা : উম্মুল ওয়ারা সুইটি

জামায়াত শিবিরের ঘুপচি কৌশল ।। সেলিম জাহিদ

জামায়াত শিবিরের ঘুপচি কৌশল
সেলিম জাহিদ
হঠাৎ ঘুপচি মিছিল, সংক্ষিপ্ত সমাবেশ, সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটেই কর্মসূচি শেষ। বলে-কয়ে মাঠে নামলে পুলিশ ধাওয়া দেয়, লাঠিপেটা করে; গ্রেপ্তারও হতে হয়। তাই রাজপথে সরকারবিরোধী মিছিল-সমাবেশের এই নতুন কৌশল নিয়েছে জামায়াত ও ছাত্রশিবির।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মী ফারুক হোসেন হত্যার পর পুলিশ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় ও সমাবেশে বাধা দিতে শুরু করলে তারা এ কৌশল নেয়। প্রায় এক মাস ধরে এই কৌশলে নানান দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে জামায়াত-শিবির। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে ছাত্রশিবির কখনো সকাল ৯টায়, আবার কখনো রাত ১০টায় মিছিল করছে। বিক্ষোভ-সমাবেশের খবর আগাম না জানিয়ে পরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গণমাধ্যমকে জানানো হয়।
জামায়াতের একজন সক্রিয় কর্মী জানান, ঝটিকা মিছিল-সমাবেশ করতে দলের নেতা-কর্মীরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় কিছু প্রাক প্রস্তুতি নেন ও সতর্কতা অবলম্বন করেন। কর্তব্যরত পুলিশের অবস্থান পর্যবেক্ষণে রেখে তাঁরা জড়ো হন। মিছিলের আগেই নেতা-কর্মীরা এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান করেন। প্রথমে ৮-১০ জন মিছিল শুরু করেন, চারদিক থেকে লোক জড়ো হয়ে তা দীর্ঘ মিছিলে রূপ নেয়।
সূত্রের দাবি, নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ মিছিল ও সমাবেশের নিরাপত্তার জন্য ওই সময় আশপাশে পাহারায় থাকে। হাততালি দিয়ে তারা মিছিলকারীদের উৎসাহ জোগান। সর্বশেষ গত শনিবার 'ভাত চাই, কাজ চাই' দাবিতে রাজধানীর শান্তিনগর, মতিঝিল ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে জামায়াত।
সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর জামায়াত বিষয়টির উল্লেখ করে বলেছে, '...বিক্ষোভ মিছিলটি কাকরাইল মোড় থেকে শুরু হয়ে শান্তিনগর চৌরাস্তায় গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। এ সময় রাস্তার উভয় পাশ্র্বে ও ভবনের ছাদ থেকে হাজার হাজার জনতা করতালির মাধ্যমে মিছিলকে স্বাগত জানায়।'
বিষয়টির উল্লেখ করলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বলেন, 'এটা কি তোমার বক্তব্য, না আওয়ামী লীগের বক্তব্য?' পরে তিনি বলেন, 'জনগণ সরকারের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ, এই করতালি তারই স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।'
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম শনিবার কাকরাইল থেকে বের হওয়া মিছিলের নেতৃত্ব দেন। এই কৌশল সম্পর্কে এ টি এম আজহার বলেন, 'আমরা নিয়ম মেনে সভা-সমাবেশের অনুমতি নিয়েও প্রশাসনের সহযোগিতা পাচ্ছি না। সরকার অন্যায়ভাবে আমাদের কেবল বাধাই দিচ্ছে না, লাঠিচার্জ, টিয়ার শেলও নিক্ষেপ করছে। এ কারণেই হয়তো স্থানীয় সংগঠন এ কৌশল নিয়েছে।'
মিছিলকারীদের জনতার স্বাগত জানানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'হাততালি প্রমাণ করে, আসলে সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই।'
গতকাল মঙ্গলবার দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদ আগামী ১৫ মে পর্যন্ত ২৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আজ ২১ এপ্রিল থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে সাত দিনের গণসংযোগ অভিযান উদ্বোধনের কথা জানান তিনি। কর্মসূচির মধ্যে আছে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাবিতে আলোচনা, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, নারী নির্যাতন ও বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার প্রতিবাদে প্রতিবাদ দিবস, ওলামা সমাবেশ ইত্যাদি।

মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত বিশ্বকোষ

মাহবুবুর রহমান জালাল, মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত বিশ্বকোষ
আবদুল্লাহ আল ইমরান
ক্ষমতার পালাবদলে পাঁচ বছর পর পর বদলে যায় এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস। বছরের পর বছর ধরে সরকারের অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। '৭৫ পরবর্তী সরকারগুলোতে ঘাপটি মেরে থাকা '৭১ সালের পরাজিত শক্তি ও প্রেতাত্দারা কৌশলে ধ্বংস করেছে অনেক মূল্যবান উপাদান। রাষ্ট্রীয় আর্কাইভগুলো থেকে সরিয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এখন প্রয়োজন সেই সময়কার পেপার কাটিং, সংবাদ, ছবি, প্রবন্ধ নিবন্ধ, চলচ্চিত্র, গান, পোস্টার, ভিডিও চিত্র, বিভিন্ন দূতাবাসের পাঠানো প্রেসনোট এবং বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রকাশিত সংবাদ; যাতে করে প্রমাণ করা যায় চিহ্নিত ব্যক্তিদের অপরাধ। অথচ সরকারি তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠেনি সেই সময়কার মূল্যবান দলিলপত্রের কোনো সংগ্রহশালা।
দেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিলগুলো সহজে খুঁজে পাওয়া আজ কষ্টকর। দেশে যে কাজটি সরকারের পক্ষেই করা সম্ভব হয়নি, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেই দুরূহ কাজটিই বিদেশের মাটিতে করেছেন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জালাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস প্রবাসী এ মানুষটি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত বিশ্বকোষ বলা যায় জালালকে, যিনি পরম মমতায় সংগ্রহ করে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান দলিল ও ইতিহাস। দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহের অব্যবস্থাপনা এবং ক্রমে বিলুপ্ত হতে দেখে জালাল ভেতরে ভেতরে এগুলো সংরক্ষণের তাড়না অনুভব করেন। নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেই হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পেঁৗছে দিতে চান স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সে কারণেই নিজ অর্থ এবং পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন অপূর্ব এক সংগ্রহশালা। কী নেই তাঁর সংগ্রহে? বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সংক্রান্ত যাবতীয় খবর জালালের সংগ্রহে আছে, যার মাধ্যমে জানা যাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং কখন, কোথায়, কে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। একাত্তরে মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে যে শুনানি হয়, তার বিশদ বর্ণনাও সংরক্ষিত আছে তাঁর কাছে। কয়েক বছর আগে মার্কিন প্রশাসন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছে গোপন প্রামাণ্য দলিল। সে দলিলও সংগ্রহ করেছেন জালাল। আছে বাংলা, ইংরেজি এবং উর্দু ভাষায় রচিত মুক্তিযুদ্ধের ওপর পাঁচ শতাধিক বই। জালাল জানান, 'আমার কাছে সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত বই এবং লেখাগুলো। কেননা সেখানে স্বাধীনতাবিরোধীদের সব বক্তব্য এবং দালাল, আলবদর ও আলশামসদের অপরাধের বিবরণ পাওয়া যায়।' মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত সাহিত্য, গান, পোস্টার, সিনেমা কিংবা দুর্লভ সব স্থিরচিত্র_যেখানে যা পেয়েছেন সংগ্রহ করেছেন তিনি। একজন প্রবাসী বাঙালি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অবিকৃতভাবে তা জানানোতে যে বিশাল ভূমিকা পালন করছেন সেটি সত্যিই বিরল।

যেভাবে শুরু
জালাল জানালেন তাঁর সংগ্রহশালা তৈরির গোড়ার কথা। 'স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের বাসায় '৭১ সালের বই-পত্রিকা সংগ্রহ করা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আমার মেঝ ভাইয়ের মাধ্যমে আমেরিকা আসার সুযোগ পেলে সংগ্রহ কার্যক্রম আরো ব্যাপকতা পায়।' জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর যখন একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন তখন জালালের স্বপ্নগুলো ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল। তাঁর ভাষায়, 'বিরাশিতে এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর মনে হলো বাংলাদেশ আর নিরাপদ নয়। অনেক উত্থান-পতন দেখলেও সুদিন যে আসবে সে বিশ্বাস হৃদয়ে ছিল। কিন্তু নতুন করে সামরিক শাসন শুরু হলে আশাবাদী হওয়ার আর কোনো কারণ অবশিষ্ট থাকল না। এরপর স্ত্রী-শিশুকন্যাকে নিয়ে মেঝ ভাইয়ের মাধ্যমে দেশান্তরী হই। আমেরিকায় বসতি স্থাপনের বাসনা আমার কোনোকালেই ছিল না।' সেখানে বসেই তিনি শুরু করেন স্বাধীনতার দলিল বা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মূল কাজ। ডালাসে নিজ বাসাতেই গড়ে তুলেছেন আর্কাইভ। এটি ছিল নেশার মতো। স্বল্প আয়ের মধ্যেও তিনি চালিয়ে গেছেন ব্যয়বহুল এ সংগ্রহ অভিযান। যেখানেই নতুন কোনো তথ্যের খোঁজ পেয়েছেন গুরুত্বের সঙ্গে সংগ্রহ করেছেন সেটি। এ সংগ্রহশালার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানানো যেমন জালালের উদ্দেশ্য, তেমনি রয়েছে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, 'এ দলিলপত্রের মাধ্যমে শুধু বীরত্বের কথা নয়, বরং যেটি বিশেষ করে জানা যাবে সেটি হলো, কারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, একাত্তরে কাদের সরাসরি মদদে শান্তি কমিটি, আলবদর, রাজাকার, আলশামস বাহিনীগুলো গঠিত হয়েছিল এবং মানবতার বিরুদ্ধে কী জঘন্য অপরাধ তারা করেছিল। হানাদারদের দোসর জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগের নেতারা সেদিন দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কী ভূমিকা নিয়েছিল_সেসব তথ্য আজকের আলো-আঁধারিতে ঘেরা বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে জানাতেই মূলত আমার এ কাজের সূচনা।' এ সংগ্রহের কাজে তাঁকে অনেক প্রতিকূলতা পার হতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়_'আমার নজর সব সময় ছিল দুর্লভ তথ্যগুলোর দিকে। সেসব বই বা দলিল সংগ্রহ করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন হতো। তা ছাড়া পাওয়াও যেত না সব সময়। এখানকার লাইব্রেরিগুলোয় (আমেরিকায়) একটা নিয়ম আছে। নাম 'ইন্টারলোন'। এ নিয়মে কোনো লাইব্রেরিতে কোনো বই না থাকলে অন্য লাইব্রেরি থেকে তারা কাঙ্ক্ষিত বই গ্রাহকদের সংগ্রহ করে দেয়। এভাবেই বইগুলো বা তথ্যগুলো জোগাড় করেছি।' তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'সবচেয়ে বেশি অসুবিধা বাংলাদেশ থেকে কোনো বই বা তথ্য সংগ্রহ করা। বাংলাদেশের কেউ আমার কাছে তথ্যসংক্রান্ত কোনো সাহায্য চাইলে আমি যেভাবেই পারি তা পাঠাই; কিন্তু আমি যখন কিছু চাই তা আর পাই না।' এত কিছুর পরও তিনি মনে করেন, দেশের প্রতিটি মানুষের জানা দরকার মুক্তিযুদ্ধে কাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ এবং কারা চায়নি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হোক। সে জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল। আর এ তাগিদেই জাতীয় এই গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এম এম আর জালাল।

ক্লান্তিহীন নিরলস প্রচেষ্টা
মাহবুবুর রহমান জালালের সংগ্রহশালা এতটাই সমৃদ্ধ যে শুধু প্রবাসীরাই নন, বাংলাদেশের বহু বরেণ্য ব্যক্তি, গবেষক ও প্রচারমাধ্যমের সংশ্লিষ্টরা প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তথ্যের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হন। তিনিও হাসিমুখে তাঁদের সহযোগিতা করেন। বিনিময়ে তাঁর নামটি প্রচার হোক সেটিও তিনি চান না। তাঁর কষ্ট করে গড়ে তোলা তথ্যভাণ্ডার দিয়ে অন্যরা নাম কামাচ্ছে এ নিয়েও তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই, আছে আনন্দ। সে আনন্দ আগামী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে পারার। দেশের কোনো সাংবাদিকের যেকোনো তথ্যের প্রয়োজনে তিনি সদা প্রস্তুত। নিজ তাগিদেই তিনি কাঙ্ক্ষিত দলিল ও তথ্য পিডিএফ ফাইল করে ই-মেইল করেন সাহায্যপ্রার্থী সাংবাদিকের কাছে। এভাবেই ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে এ দেশের মানুষকে রক্ষা করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে ইন্টারনেটে বাংলাদেশের খবর পড়ে তাঁর দিন শুরু হয়। গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেলে তিনি তা সংগ্রহশালায় আর্কাইভ করে রাখেন। প্রবাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি হাজির হন তাঁর বিপুল সংগ্রহশালা নিয়ে। একটা টেবিল নিয়ে বসে পড়েন তা প্রদর্শনে। তিনি বলেন, 'সবাই শুধু মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা শুনতে চায়। কেউ জানতে চায় না গণহত্যা কারা করেছিল, কারা নারীদের নির্যাতন করেছিল। আমার সংগ্রহটা সেসব মানুষকে চিনতে সাহায্য করবে। যখন কোনো মা তাঁর সন্তানকে এগুলো দেখিয়ে বলেন, দেখ বাবা, মানুষ নামের নরপশুগুলো কী ভয়ঙ্কর কাজ করেছিল, তখন খুব ভালো লাগে।' বিদেশের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের গান, পোস্টার, সাহিত্য, সিনেমা, ছবি, পেপার কাটিং, দেশি-বিদেশি দলিল উপস্থাপনের মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস বিতরণে তিনি রেখে চলেছেন অনবদ্য এক ভূমিকা। মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও তথ্য প্রদর্শনীর জন্য প্রবাসীদের কাছ থেকে পেয়েছেন 'সুচিন্তা স্বাধীনতা পদক ২০০৬'। এ ছাড়াও ওয়ার্ল্ড স্ট্যাম্প এক্সিবিশনে ব্রোঞ্জ পদক তাঁর কাজের আর একটি স্বীকৃতি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জালালের সংগ্রহশালা
সম্প্রতি সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। চলছে অপরাধের সাক্ষী ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কার্যক্রম। তদন্তকারী সংস্থার প্রতিনিধিদল বিভিন্ন সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে তথ্য দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা করছেন। চলছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্যের যাচাই-বাছাই। এ পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তকারী সংস্থার জন্য জালালের সংগ্রহশালা রাখতে পারে সহায়ক ভূমিকা। বাংলাদেশ সরকার চাইলে জালাল নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দেবেন সহযোগিতার হাত। কেননা জালাল মনেপ্রাণে প্রার্থনা করেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। সে বিচার কার্যক্রমে তাঁর সংগ্রহশালা বিন্দুমাত্র কাজে লাগলেও সার্থক হবে তাঁর পরিশ্রম।